জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতদের সরকারি তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। তদন্তে ১৩ জনকে ‘শহিদ’ হিসেবে তালিকাভুক্তির তথ্য ভুয়া এবং ২০৮ জন ‘আহত জুলাইযোদ্ধার’ তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ২২১ জনের গেজেট বাতিল করেছে সরকার।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর জানিয়েছে, মিথ্যা তথ্য প্রদান, দ্বৈত নিবন্ধন এবং ভুয়া দাবির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় গত ১ জানুয়ারি থেকে কয়েক ধাপে এসব গেজেট বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে ১২৮ জনের ভাতাসহ সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে জমা দেওয়া আবেদন যাচাই করেও প্রায় ২০০টি আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। আরও প্রায় ৬০০টি আবেদনে গুরুতর অসংগতি পাওয়া গেছে। এসব আবেদনের মধ্যে একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন, শহিদের পরিচয়ে আহত হিসেবে আবেদন, তথ্যের গরমিল এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রে অসঙ্গতির বিষয় উঠে এসেছে। বর্তমানে শতাধিক সন্দেহজনক আবেদন ও গেজেটের তদন্ত চলছে।
প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের স্বীকৃতিতে গুরুত্ব:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আনোয়ারুল নাসের জানিয়েছেন, প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের স্বীকৃতি ও তাদের অধিকার নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি সুবিধা গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়া প্রতিটি ঘটনা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যাচাই করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাদের গেজেট বাতিলের পাশাপাশি সরকারি সুবিধাও বন্ধ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয়, বরং প্রকৃত অবদান রাখা ব্যক্তিদের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন যাচাই-বাছাই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্থগিত ১২৮ জনের মধ্যে ১০৫ জনের তথ্য মিথ্যা:
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, প্রতারণার অভিযোগে সুবিধা স্থগিত করা ১২৮ জনের মধ্যে ১০৫ জনের ক্ষেত্রে আন্দোলনে আহত হওয়া বা সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ২৩ জনের নাম গেজেটে দুইবার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব অনিয়মের কারণে তাদের গেজেট বাতিল করা হয়েছে এবং সরকারি সুবিধাও বন্ধ করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮৪৩ শহিদসহ মোট ১৪ হাজার ৩৭০ জন জুলাইযোদ্ধার গেজেট কার্যকর রয়েছে। অর্থাৎ কার্যকর গেজেটভুক্ত শহিদ ও জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা ১৫ হাজার ২১৩ জন।
সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যয় প্রায় ৯৭৩ কোটি টাকা:
জুলাইযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের জন্য সরকার বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ পর্যন্ত এসব কর্মসূচিতে মোট ৯৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার ৯১৬ টাকা ব্যয় হয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৮০৫টি শহিদ পরিবারের মধ্যে ২২২ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার সঞ্চয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিটি শহিদ পরিবারকে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এ ছাড়া ৮৭০টি শহিদ পরিবারের ১ হাজার ২৭ জন উপকারভোগীকে মাসে ২০ হাজার টাকা করে মোট ১৮ কোটি ৪৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭০৯ টাকা ভাতা দেওয়া হয়েছে। আহত জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৪৫৯ জনকে এককালীন অনুদান হিসেবে ২১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং ১৩ হাজার ৪৩৯ জনকে মাসিক ভাতা হিসেবে ১৬৯ কোটি ৩০ লাখ ১৯ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫৪ আহত যোদ্ধা:
গুরুতর আহত জুলাইযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য বিদেশেও পাঠানো হয়েছে। ১৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ১৫৪ জনকে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া ও তুরস্কে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ জন চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন এবং ৫৪ জন এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দেশে সরকারি হাসপাতালেও তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছেন।
শাস্তির বিধান রয়েছে আইনে:
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে জুলাই শহিদ বা জুলাইযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী, মিথ্যা তথ্য দেওয়া, তথ্য গোপন করা বা ভুয়া নথি ব্যবহার করে সরকারি সুবিধা নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা অবৈধভাবে নেওয়া সরকারি সুবিধার দ্বিগুণ অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি প্রতারণার মাধ্যমে পাওয়া গেজেট, স্বীকৃতি ও সরকারি সুবিধা বাতিল এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সুশাসনবিষয়ক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শহিদ পরিবার ও আহতদের জন্য সরকারের সহায়তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে অনিয়ম হলে পুরো ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, প্রকৃত উপকারভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

