দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আবাসিক খাত যখন চরম ভোগান্তির মুখে, তখনই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আরেকটি বিষয়। সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাস হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে, যার বড় অংশই সিস্টেম লস নামে দেখানো হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে এর অধিকাংশই গ্যাস চুরি, অবৈধ সংযোগ এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ গ্যাসের কোনো কার্যকর হিসাব পাওয়া যায় না। অর্থাৎ প্রতিদিন ২৫ কোটি ঘনফুটেরও বেশি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার নির্ধারিত গড় বিক্রয়মূল্য অনুযায়ী যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা।
তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লসকে কারিগরি কারণে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করে। সেই হিসাব বাদ দিলে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহার বা চুরি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আর্থিক মূল্য প্রতিদিন প্রায় ১৪ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৫ হাজার ১১০ কোটি টাকা।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশের বহু শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না, ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় অনেক পরিবার পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে স্বাভাবিকভাবে রান্নাও করতে পারছে না।
এই বাস্তবতায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাস চুরি হওয়া জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। এর ফলে ভর্তুকির বোঝাও দ্রুত বাড়ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। শুধু চলতি অর্থবছরেই এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি অবৈধ ব্যবহার ও অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়, তাহলে এই বিপুল ভর্তুকির চাপও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক এলাকায় অবৈধ সংযোগ বেড়েছে। শুধু আবাসিক নয়, বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, চুন কারখানা, ওয়াশিং কারখানা এবং কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে রাজধানী, গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, কেরানীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ সংযোগের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে প্রতি মাসেই হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে এবং নিজস্ব টিমও মাঠে কাজ করছে।
তবে তাদের অভিযোগ, অভিযান শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই অসাধু চক্র আবার নতুন করে সংযোগ দিয়ে দেয়। পর্যাপ্ত জনবল, নিয়মিত নজরদারি এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আরও সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সিস্টেম লস কমাতে সরকার ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। লক্ষ্য ছিল সিস্টেম লস ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা। কিন্তু সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সেটি এখনও প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে।
এ কারণে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাময়িক অভিযান নয়, বরং স্থায়ীভাবে অবৈধ সংযোগ নির্মূল করার কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২ শতাংশের বেশি সিস্টেম লসকে কারিগরি ক্ষতি হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ খুবই সীমিত। তাদের মতে, অতিরিক্ত ক্ষতির বড় অংশই কার্যত গ্যাস চুরি।
তারা আধুনিক মিটারিং ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ, বিতরণ নেটওয়ার্ককে ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ করে নজরদারি, পুরোনো পাইপলাইন প্রতিস্থাপন এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস চুরি শুধু রাজস্ব ক্ষতির বিষয় নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সুশাসনের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলে একদিকে যেমন সরকারের ভর্তুকির চাপ কমবে, অন্যদিকে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহও আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।

