খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security) এবং নিরাপদ খাদ্য (Food Safety)—পরস্পর সম্পর্কিত হলেও এদের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ খাদ্যের পরিমাণগত উৎপাদনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করলেও, খাদ্যের গুণগত মান বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জাতীয় পর্যায়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, নিরাপদ খাদ্যের সংকট কোনো একক কারণে তৈরি হয়নি; বরং উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার প্লেট পর্যন্ত (Farm to Fork) প্রতিটি ধাপে নানা ধরনের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা এর জন্য দায়ী। একটি বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি ও নিরাপদ খাদ্যের প্রকৃত সমস্যা এবং এর সমাধানগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
১. নিরাপদ খাদ্যের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
রাসায়নিক উপকরণের অপব্যবহার ও রেসিডিউ সমস্যা
আধুনিক কৃষিতে ফলন বাড়াতে এবং রোগবালাই দমনে সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা। কিন্তু মূল সমস্যাটি তৈরি হয় এর অপব্যবহারে।
অসচেতনতা ও ভুল প্রয়োগ: অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা সঠিক মাত্রা (Dose) ও প্রয়োগের সঠিক সময় না জেনেই অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করেন।
প্রি-হারভেস্ট ইন্টারভাল (PHI) না মানা: কীটনাশক প্রয়োগের পর নির্দিষ্ট কয়েক দিন (যা রাসায়নিকের ধরনের ওপর নির্ভর করে) ফসল সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকতে হয়। এই নিয়ম না মানার কারণে খাদ্যে ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ বা রেসিডিউ থেকে যায়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (Maximum Residue Limit – MRL) অতিক্রম করে।
পরিবেশগত দূষণ ও ভারী ধাতুর (Heavy Metals) অনুপ্রবেশ
কেবল কৃষি উপকরণ নয়, পরিবেশগত দূষণ খাদ্যে বিষাক্ত উপাদান প্রবেশের অন্যতম বড় মাধ্যম।
অপরিকল্পিত শিল্পকারখানার বর্জ্য (যেমন: ডাইং, ট্যানারি) সরাসরি জলাশয়ে মিশে সেচের পানির মাধ্যমে কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে। এর ফলে খাদ্যে সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়ামের মতো কার্সিনোজেনিক (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী) ভারী ধাতু যুক্ত হচ্ছে। অনেক অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক থাকায়, সেচের মাধ্যমে তা ধান ও অন্যান্য ফসলে জমছে।
অণুজীব দূষণ (Microbial Contamination) ও মাইকোটক্সিন
খাদ্য দূষণের আরেকটি বড় কারণ অণুজীব ও ছত্রাক, যা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।
আফলাটক্সিন: ফসল কাটার পর সঠিক আর্দ্রতায় শুকাতে না পারলে বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে সংরক্ষণ করলে ধান, ভুট্টা, বাদাম ও মসলাজাতীয় ফসলে Aspergillus ছত্রাক জন্মায়। এই ছত্রাক থেকে নিঃসৃত ‘আফলাটক্সিন’ লিভার ক্যান্সারের অন্যতম কারণ।
জীবাণু দূষণ: মাঠ থেকে ফসল তোলার পর অনেক সময় দূষিত নদীর পানি বা ড্রেনের পানিতে শাকসবজি ধোয়া হয়, যার মাধ্যমে ই-কোলাই (E. coli) বা সালমোনেলার মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া খাদ্যে প্রবেশ করে।
মাটির স্বাস্থ্যহানি ও পুষ্টির ঘাটতি: ক্রমাগত নিবিড় চাষাবাদের ফলে বাংলাদেশের মাটির জৈব পদার্থ (Organic Matter) বিপজ্জনকভাবে কমে ১.৫%-এর নিচে নেমে এসেছে। সুষম সার (Balanced Fertilizer) ব্যবহার না করে কেবল ইউরিয়া বা নির্দিষ্ট কিছু সারের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে মাটিতে অণুজীবের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং খাদ্যের নিজস্ব পুষ্টিগুণ (যেমন: জিংক, আয়রন) কমে যাচ্ছে।
সংগ্রহোত্তর ক্ষতি ও ভেজাল: যথাযথ কোল্ড চেইন (Cold Chain) এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার অভাবে দেশে উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়। এই ক্ষতি এড়াতে অসাধু ব্যবসায়ীরা অনেক সময় অননুমোদিত রাসায়নিক, টেক্সটাইল রং (Food color হিসেবে) বা ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকিস্বরূপ।
২. বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত সমাধানের উপায়
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে কাউকে ঢালাওভাবে দোষারোপ না করে পুরো সিস্টেমের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
উত্তম কৃষি চর্চা (GAP) ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM): কৃষকদের ঢালাও রাসায়নিক ব্যবহারের বদলে ‘সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা’ বা IPM-এ অভ্যস্ত করতে হবে। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ আঠালো ফাঁদ, জৈব বালাইনাশক এবং উপকারী পোকার মাধ্যমে পোকা দমনকে উৎসাহিত করতে হবে।
Good Agricultural Practices (GAP) নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে ফসল উৎপাদনের প্রতিটি ধাপের ডকুমেন্টেশন রাখতে হবে, যেন খাদ্যের উৎস সহজেই চিহ্নিত (Traceability) করা যায়।
রেসিডিউ ল্যাব ও মনিটরিং বৃদ্ধি: মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে বাজার পর্যন্ত কৃষিপণ্যের নিয়মিত ল্যাব টেস্ট করতে হবে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে (DAE) যৌথভাবে খাদ্যের MRL (Maximum Residue Limit) নিয়মিত মনিটর করতে হবে।
শিল্পদূষণ রোধ ও নিরাপদ সেচ: শিল্পাঞ্চলগুলোর কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি (ETP) চালু রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে কৃষিজমি ও জলাশয়কে ভারী ধাতুর দূষণ থেকে বাঁচাতে হবে। দূষিত এলাকায় খাদ্যশস্যের বদলে ফুল বা পাটের মতো অখাদ্য ফসলের চাষ বাড়াতে হবে।
সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও কোল্ড চেইন: ফসল কাটার পর বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী ‘কোল্ড চেইন’ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। এতে পচনশীল কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে এবং অস্বাস্থ্যকর রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ হবে।
মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার: মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষম সার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট), ট্রাইকো-কম্পোস্ট ও সবুজ সারের ব্যবহার বাড়িয়ে মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।
নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, কৃষকের সঠিক প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা, সুশাসন এবং ভোক্তার সচেতনতা—সবগুলোরই সমান গুরুত্ব রয়েছে। উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক—সবাইকে যার যার জায়গা থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তবেই আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।
লেখক: মিজান মাজনুন
পরিবেশ কর্মী ও সাংবাদিক।

