রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের আলোচনা আবারও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, খুব শিগগিরই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। যদিও বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আগের সময়ের শীর্ষ সাংবিধানিক পদে থাকা একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে তিনি এখনো দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণেই তার সম্ভাব্য পদত্যাগের খবরকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে চলতি বছরের মে মাসে লন্ডন সফরের সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথোপকথনের বিষয়টি। সূত্রগুলোর দাবি, চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতি টেলিফোনে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন।
জানা যায়, ৯ মে তিনি লন্ডনে যান এবং ১৮ মে দেশে ফেরেন। পরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওই ফোনালাপের বিষয়ে জানতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এরপর থেকেই রাষ্ট্রপতির অবস্থান নিয়ে সরকারের ভেতরে আলোচনা শুরু হয় বলে জানা গেছে। সরকারের একটি অংশ মনে করছে, গণঅভ্যুত্থানের পরও আগের সরকারের সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যক্তির দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। ফলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে তারা একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টিকে শুধু একটি ফোনালাপের ঘটনায় সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন সমীকরণ এবং সাবেক সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যুও এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের পেছনের বিষয়টি আরও বিস্তৃত। তার মতে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনা, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ তৎপরতা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়েই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। একই সময়ে দেশের ভেতরে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম পুনর্গঠনের কিছু উদ্যোগও নজরদারিতে রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ হলে সেটিকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, এর মাধ্যমে সরকার দেখাতে চাইতে পারে যে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা আগের ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নিয়ে ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
এদিকে গত ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে রাষ্ট্রপতি কবে পদত্যাগ করবেন কিংবা তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে—এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বঙ্গভবন-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এক-দুই দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যদিও আগামী ২৯ জুলাই চারটি দেশের অনাবাসিক রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণের একটি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি এখনো রাষ্ট্রপতির রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জানিয়েছিলেন, পরবর্তী নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পদত্যাগ করতে চান। পরে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, আর না চাইলে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—শেখ হাসিনার সঙ্গে কথিত ফোনালাপই কি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের মূল কারণ, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় রাজনৈতিক সমীকরণ? আপাতত বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তবে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

