এম এস রহমান, পাবনা প্রতিবেদক—
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয়, সরঞ্জামের মূল্য এবং অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনিয়ম ও অতিরিক্ত খরচের অভিযোগকে ‘ভুল ব্যাখ্যা’ হিসেবে দাবি করেছে প্রকল্পের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)।
সংস্থাটি বলছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিশেষ চুক্তিগত কাঠামো ও জটিল আর্থিক ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি না বুঝে কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করায় এ ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার এক লিখিত ব্যাখ্যায় এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান এ বক্তব্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এখন পরিচালনার প্রস্তুতির শেষ ধাপে রয়েছে। এটি দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এর পরিকল্পনা, নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ, পরীক্ষা ও কমিশনিংয়ের পদ্ধতি সাধারণ অবকাঠামো প্রকল্পের মতো নয়।
ড. জাহেদুল হাসান জানান, বাংলাদেশ ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে স্বাক্ষরিত আন্তঃসরকারি চুক্তির (IGA) আওতায় রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এই চুক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC) ও রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের (JSC Atomstroyexport) মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কমিশনিং (EPCC) চুক্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য আলাদা করে ইন্টারগভর্নমেন্টাল ক্রেডিট অ্যাগ্রিমেন্ট (IGCA) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করেন, EPCC চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি কেনা বা সরবরাহের চুক্তি নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ, পরীক্ষা, কমিশনিং এবং নিরাপদ পরিচালনার উপযোগী অবস্থায় হস্তান্তরের জন্য করা সমন্বিত চুক্তি।
এই চুক্তির আওতায় প্রকৌশল নকশা, নিরাপত্তা বিশ্লেষণ, যন্ত্রপাতি উৎপাদন, স্থাপন, বিভিন্ন সিস্টেমের সমন্বয়, কমিশনিং, প্রযুক্তিগত নথি তৈরি এবং অপারেটরদের প্রশিক্ষণসহ পুরো প্রকল্পের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এ কারণে EPCC চুক্তিতে আলাদা করে কোনো যন্ত্রপাতি, ভবন, পাইপলাইন, নির্মাণকাজ, স্থাপন বা কমিশনিংয়ের পৃথক মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। বরং পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি সমন্বিত Whole Plant Contract Price নির্ধারণ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, এই চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট ধাপ বা মাইলস্টোন (Milestone) সম্পন্ন হওয়ার ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাই কোনো Milestone Payment-কে নির্দিষ্ট কোনো যন্ত্রপাতির দাম, নির্মাণ ব্যয় বা কমিশনিংয়ের আলাদা মূল্য হিসেবে উপস্থাপন করা প্রকল্পের প্রকৃত চুক্তিগত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা
প্রকল্পের অর্থায়ন প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল হাসান জানান, রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ১০ শতাংশ বহন করছে বাংলাদেশ সরকার। বাকি ৯০ শতাংশ রাশিয়ান সরকারের রাষ্ট্রীয় ঋণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, EPCC চুক্তি প্রকল্প বাস্তবায়নের কারিগরি বিষয় নির্ধারণ করে, অন্যদিকে IGCA পরিচালনা করে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া। দুটি চুক্তির উদ্দেশ্য আলাদা হলেও উভয়ই একই প্রকল্পের অংশ।
অর্থছাড়ের ধাপ সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো মাইলস্টোন সম্পন্ন হলেই সরাসরি ঠিকাদারকে অর্থ দেওয়া হয় না। প্রথমে চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কাজ যাচাই করা হয় এবং গ্রহণযোগ্যতার দলিল (Acceptance Document) স্বাক্ষর করা হয়। এরপর ওই মাইলস্টোন ঋণচুক্তির আওতায় অর্থছাড়ের উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তী সময়ে IGCA-এর বিধান অনুযায়ী রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ঋণের অর্থ ছাড় করে। ফলে মাইলস্টোন সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ পরিশোধের বিষয়টি কার্যকর হয় না এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনও নিজ উদ্যোগে অর্থ প্রদান করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, Milestone Payment কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি, সরবরাহ, স্থাপন বা কমিশনিংয়ের মূল্য নয়; এটি পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, স্থাপন, পরীক্ষা ও কমিশনিংয়ের অগ্রগতির একটি নির্ধারিত ধাপ সম্পন্ন হওয়ার বিপরীতে চুক্তিতে নির্ধারিত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা।
প্রযুক্তি ও ক্রয় পদ্ধতি নিয়ে ব্যাখ্যা
ড. জাহেদুল হাসান জানান, রূপপুর প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে রাশিয়ার VVER-1200 Generation III+ প্রযুক্তি। এটি একটি সমন্বিত ও মালিকানাধীন (Proprietary) পারমাণবিক প্রযুক্তি। নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের জন্য প্রকল্পে স্বীকৃত EPCC পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি অপারেটরদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সরকারি ক্রয় আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণভাবে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও প্রযুক্তিগত স্বাতন্ত্র্য, মেধাস্বত্ব, নিরাপত্তা এবং আন্তঃসরকারি চুক্তির ক্ষেত্রে একক উৎস থেকে ক্রয়ের আইনি সুযোগ রয়েছে। রূপপুর প্রকল্পও এ ধরনের বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রকল্পের আওতাভুক্ত।
এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, উচ্চপ্রযুক্তি সক্ষমতা এবং টেকসই উন্নয়নের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। তাই এ প্রকল্প মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়ন নীতি, চুক্তির কাঠামো এবং অর্থায়ন ব্যবস্থাকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল আলোচনা প্রকল্প সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে এবং সঠিক তথ্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

