দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংকট এখন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতপশিল, বিশেষ ছাড় এবং নীতিগত শিথিলতার মাধ্যমে সমস্যার সাময়িক সমাধানের চেষ্টা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। বরং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এই বাস্তবতায় এবার ধাপে ধাপে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, শুরুতে খেলাপি ঋণ আদায়ে নমনীয় নীতি অনুসরণ করা হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ পরিচালকদের মালিকানা পর্যন্ত বাতিল হতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বিক্রি, একীভূতকরণ কিংবা অবসায়নের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
খেলাপি ঋণ কমানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য
বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই হার ২০ শতাংশে এবং আগামী বছরের শেষে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মোট ২১টি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একাধিক বৈঠক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রথম ধাপে থাকছে সুদ মওকুফের সুযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, সব ঋণখেলাপি ইচ্ছাকৃত নন। অনেক ব্যবসায়ী নানা অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ সুদ ও ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই প্রথম ধাপে তাদের জন্য একটি ‘এক্সিট পলিসি’ কার্যকর করা হচ্ছে।
এই নীতির আওতায় ঋণগ্রহীতা অন্তত মূল ঋণ পরিশোধ করলে অনেক ক্ষেত্রে সুদ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের একটি অংশ বা পুরোটা মওকুফের সুযোগ পাবেন। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই নমনীয় নীতি কার্যকর থাকবে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, এটি কোনো স্থায়ী সুবিধা নয়। ডিসেম্বরের পর ঋণ আদায়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
নতুন করে পুনঃতপশিলের সুযোগ সীমিত
অতীতে খেলাপি ঋণ কমানোর নামে বারবার পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হলেও তার সুফল খুব একটা পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে বিশেষ সুবিধায় প্রায় ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়েছে। গত বছর আরও ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা পুনঃতপশিল হয়েছে।
কিন্তু এত বিপুল পুনঃতপশিলের পরও গত বছর পর্যন্ত অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুনঃতপশিল করা অধিকাংশ ঋণও শেষ পর্যন্ত আদায় হয়নি।
এই অভিজ্ঞতার কারণে ভবিষ্যতে নতুন করে বিশেষ পুনঃতপশিল নীতির পথে না হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে মালিকানা হারাবেন পরিচালক
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে কঠোর সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো ব্যাংকের পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণের ভিত্তিতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশনের ঘাটতি নির্ধারণ করা হবে। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের নির্দেশ দেওয়া হবে।
যদি কোনো ব্যাংক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকেরা তাদের মালিকানা হারাতে পারেন।
আর একবার মালিকানা হারালে পরবর্তী পাঁচ বছর তিনি দেশের কোনো ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার যোগ্য থাকবেন না।
খেলাপিদের তালিকা প্রকাশের পরিকল্পনা
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কথা ভাবছে।
যেসব ঋণগ্রহীতা নমনীয় নীতির সুযোগ পেয়েও ঋণ পরিশোধ করবেন না, তাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশ করা হতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এই তালিকা বিমানবন্দর, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এবং বিভিন্ন শাখায় টানিয়ে রাখা হতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ওপর সামাজিক ও নৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।
বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গঠন করা হবে একটি দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি।
এই প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বিপরীতে থাকা বন্ধকি সম্পত্তি নির্ধারিত মূল্যে কিনে নেবে।
তবে এতে ঋণগ্রহীতা পুরোপুরি দায়মুক্ত হবেন না।
ধরা যাক, কোনো প্রতিষ্ঠানের সুদসহ মোট ঋণ ১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্যায়নের পর সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি সেটি ১০০ কোটি টাকায় কিনল। সে ক্ষেত্রে ওই ঋণগ্রহীতার দায় কমবে মাত্র ১০০ কোটি টাকা। বাকি ৯০০ কোটি টাকার দায় আগের মতোই বহাল থাকবে।
আদালতেও আসছে বড় পরিবর্তন
খেলাপি ঋণ আদায়ের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া।
এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের প্রস্তাব করছে। লক্ষ্য হলো ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা।
এ ছাড়া খেলাপিরা যাতে সহজে উচ্চ আদালতে রিট করে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে না পারেন, সেজন্যও নতুন বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, রিট করতে হলে অনাদায়ী ঋণের অর্ধেক বা নির্ধারিত একটি অংশ আগে জমা দিতে হতে পারে।
ব্যাংক ব্যবস্থাপনাতেও আসছে নতুন নিয়ম
বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু ঋণ আদায়ের দিকেই নয়, ব্যাংক পরিচালনায়ও বড় ধরনের সংস্কার আনতে চায়।
পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—
- খেলাপি ঋণ বেশি থাকা ব্যাংকের জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর করা।
- আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা চালু করা।
- ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগে খেলাপি ঋণ আদায়ের সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত করা।
- খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি হলে প্রতি তিন মাসে গভর্নরের কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়া।
- প্রতিটি ব্যাংকার্স সভায় শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির আদায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা।
- ঋণ ঝুঁকি শনাক্তে আধুনিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা।
- সফল ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা চালু করা।
বড় ঋণে ব্যাংকের পরিবর্তে বন্ডের পরিকল্পনা
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অংশ হিসেবে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণেও পরিবর্তন আনার চিন্তা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে বন্ড ইস্যুকে উৎসাহিত করা হবে।
একই সঙ্গে একজন ঋণগ্রহীতা পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে সর্বোচ্চ কত ঋণ নিতে পারবেন, সেটিও আইন করে নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন প্রয়োজন এত কঠোরতা?
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ বলছে, কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ হলেও গত বছর শেষে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
একই সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এর পেছনে ২০টি ব্যাংকের ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি বড় ভূমিকা রেখেছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে গত বছর মাত্র ১৭টি ব্যাংক মুনাফা করতে পেরেছে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন
অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে শুধু নতুন নীতি ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। অতীতেও একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল আইনি কাঠামো এবং সুশাসনের অভাবে অনেক পরিকল্পনাই সফল হয়নি।
তাই এবারও সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যহীন ব্যবস্থা এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
যদি ঘোষিত সংস্কারগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরতে পারে। আর তা সম্ভব না হলে খেলাপি ঋণের বোঝা অর্থনীতির জন্য আরও বড় ঝুঁকিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

