কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন নতুন করে মানবিক সংকট তৈরি করেছে। টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে পদ্মার প্রবল স্রোত প্রতিদিনই গিলে খাচ্ছে ফসলি জমি, গাছপালা ও মানুষের বহু বছরের কষ্টে গড়ে তোলা সম্পদ। গত দুই সপ্তাহে উপজেলার একাধিক এলাকায় শত শত বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে এখন শুধু কৃষিজমিই নয়, বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এবারের ভাঙন অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। প্রতিদিনই নদীর পাড় ভেঙে নতুন নতুন এলাকা পদ্মার গর্ভে চলে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ।
একের পর এক জমি হারিয়ে নিঃস্ব কৃষক
দৌলতপুর উপজেলার কোলদিয়াড় গ্রামের কৃষক ইব্রাহিম আলী দীর্ঘদিন ধরে পদ্মার ভাঙনের শিকার। কয়েক দফায় তিনি প্রায় ১০ বিঘা জমি হারিয়েছেন। শেষ সম্বল হিসেবে যে অল্প কিছু জমি অবশিষ্ট ছিল, সাম্প্রতিক ভাঙনে সেটিও নদীতে চলে গেছে। এখন তিনি কার্যত ভূমিহীন।
ইব্রাহিমের মতো একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন আরও অসংখ্য কৃষক। কেউ ২০ বিঘা, কেউ ১৪ বিঘা, কেউ ৭ বিঘা, আবার কেউ ৪ থেকে ৫ বিঘা জমি হারিয়েছেন। যেসব জমিতে এবার পাট, ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের ভালো ফলনের আশা ছিল, সেগুলো এখন পদ্মার তলদেশে।
দুই সপ্তাহে ভয়াবহ ক্ষতি
স্থানীয়দের দাবি, গত ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কোলদিয়াড় থেকে ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় শতাধিক একরের বেশি আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। মরিচা ইউনিয়নের ভূরকা-হাটখোলা, কোলদিয়াড়, মাজদিয়াড় ও ফয়জুল্লাহপুরসহ প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, শুধু জমিই নয়, আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলের বাগান এবং মৌসুমি ফসলও সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক পরিবার এক মৌসুমেই তাদের প্রধান আয়ের উৎস হারিয়েছে।
বসতভিটাও হারানোর শঙ্কা
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন বসতবাড়ি নিয়ে। রফিকুল ইসলাম জানান, তাদের সাত বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। এখন কেবল বাড়িটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটিও ভাঙনের মুখে।
ভূরকাপাড়া গ্রামের মহাবুল ইসলাম বলেন, ২০ বিঘার বেশি জমি হারানোর পর এখন শুধু বসতবাড়িটিই শেষ সম্বল। ভাঙন অব্যাহত থাকলে সেটিও রক্ষা করা কঠিন হবে।
মর্জিনা খাতুন জানান, বহু কষ্টে ১৪ বিঘা জমি করেছিলেন। এখন সবই নদীগর্ভে। পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নিয়ে কীভাবে চলবেন, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। একই ধরনের অসহায় পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন বিউটি খাতুন, শুকরুন্নেসা, তবারক হোসেন, আব্দুল রশিদসহ আরও অনেকে।
স্থায়ী বাঁধের দাবি
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই পদ্মা ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
স্থানীয় কৃষক আতর আলীর মতে, সাময়িকভাবে বালুভর্তি ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। নদী শাসনের মাধ্যমে টেকসই সিমেন্টের ব্লকের স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণই একমাত্র সমাধান।
স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, ভূরকাপাড়ার একটি ছোট অংশে জিও ব্যাগ ফেলায় কিছুটা সুফল মিলেছে। কিন্তু কোলদিয়াড়, হাটখোলাপাড়া থেকে রায়টা পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকা এখনো সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
ঝুঁকিতে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন
নদীভাঙনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ে যাওয়া।
ভাঙনস্থল থেকে মাত্র প্রায় ৫০০ ফুট দূরে রয়েছে ভারত থেকে আসা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বহনকারী জাতীয় সঞ্চালন লাইন। নদী যদি একই গতিতে এগোতে থাকে, তাহলে সঞ্চালন টাওয়ার হুমকির মুখে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিদ্যুৎ সরবরাহেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর পাশাপাশি পদ্মার ঢেউ আঘাত হানছে রায়টা-মহিষকুণ্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, স্থানীয় বাজার এবং নদীতীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম।
তথ্যের ঘাটতি, তবে প্রস্তুতির কথা বলছে পাউবো
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক ভাঙনে কী পরিমাণ জমি নদীগর্ভে গেছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, জরুরি প্রতিরোধমূলক কাজের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নদী শাসনের জন্য একটি প্রস্তাব তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন ও বাজেট পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করা হবে।
ভাঙন এলাকা পরিদর্শনে সংসদ সদস্য
পরিস্থিতির ভয়াবহতার খবর পেয়ে শনিবার বেলা ১১টার দিকে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলে তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
তিনি জানান, আপৎকালীনভাবে জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলার জন্য বিশেষ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে পদ্মা নদী শাসনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের বিষয়টিও সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে।
নদীভাঙন এখন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মার ভাঙন শুধু কৃষিজমি হারানোর ঘটনা নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। ফসলি জমি হারালে কৃষকের আয় কমে যায়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে বসতবাড়ি হারানো পরিবারগুলোকে নতুন করে পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয়, যা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই ধরনের সংকট তৈরি হয়। তাই সাময়িক ব্যবস্থা নয়, নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে প্রতি বছরই নতুন নতুন পরিবার ভূমিহীন ও নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

