রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পুলিশ বাহিনীর সীমিত জনবল ও যানবাহনের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যের জন্য বরাদ্দ থাকা পুলিশের বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপকে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দায়িত্বের গুরুত্ব বিবেচনায় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টার ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে।
এর আগে গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীও নিজের নিরাপত্তা বহরের আকার ছোট করার সিদ্ধান্ত নেন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ব্যয় সংযমের যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, মন্ত্রীদের এসকর্ট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহ থেকেই ধাপে ধাপে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এখন যেসব মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহার হয়েছে, তারা সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যান, বাসভবনে হাউস গার্ড এবং ঢাকার বাইরে সরকারি সফরের সময় প্রয়োজনীয় পুলিশি নিরাপত্তা সুবিধা আগের মতোই পাবেন। অর্থাৎ নিরাপত্তা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়নি, বরং নিয়মিত চলাচলের সময় পুলিশের বিশেষ এসকর্ট সুবিধা সীমিত করা হয়েছে।
বর্তমান মন্ত্রিসভায় ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী রয়েছেন। তাদের মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের জন্য পুলিশের বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট বহাল রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম, শিল্প, বস্ত্র, পাট ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী অ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বিশেষ এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু ব্যয় কমানোর বিষয়ই নয়, পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের জনবল সংকটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একজন মন্ত্রীর নিরাপত্তা এসকর্ট দলে সাধারণত একজন উপপরিদর্শক এবং চারজন কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করেন। তাদের জন্য একটি পুলিশ পিকআপ যানবাহনও বরাদ্দ থাকে। এসব সদস্যের বেতন-ভাতা, যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি ব্যয়ের পুরো অর্থ সরকারি কোষাগার থেকেই আসে। ফলে একাধিক মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহারের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া পুলিশ বাহিনীর বর্তমান সক্ষমতাও এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে ৪৯ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন এক হাজার ৬৯১ জন পুলিশ সদস্য। অথচ প্রয়োজন রয়েছে দুই হাজার ৫৭৫ জন সদস্যের। অর্থাৎ প্রায় ৯০০ সদস্যের ঘাটতি নিয়ে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এর ফলে দায়িত্বে থাকা সদস্যদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে এবং তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপও বাড়ছে।
যানবাহনের সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনায় হামলার ঘটনায় প্রোটেকশন ইউনিটের একাধিক গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা পুড়ে যায়। সেই ক্ষতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে একটি গাড়ি দিয়েই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন ব্যয় সংকোচনের নীতির বাস্তব প্রয়োগ, অন্যদিকে পুলিশ বাহিনীর সীমিত জনবলকে জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ দমনের মতো অগ্রাধিকারমূলক দায়িত্বে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই নীতির সফলতা নির্ভর করবে জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যয়ের আরও দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর।

