হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল ডিভাইসও এখন ঢুকে পড়েছে অবৈধ বাণিজ্যের জালে। অভিযোগ উঠেছে, একটি চক্র প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে স্টেন্ট বা হার্টের রিংসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম চোরাইপথে দেশে এনে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করছে।
স্টেন্ট, বেলুন ক্যাথেটার, গাইড ওয়্যার, গাইড ক্যাথেটার, ওয়াই-কানেক্টর, ম্যানিফোল্ড এবং শিথ টাইগার ক্যাথেটারের মতো হৃদরোগ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ এই চক্রের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তুলনামূলক কম দামে এসব পণ্য সংগ্রহ করে নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অনুমোদনহীন বা যথাযথ সংরক্ষণ ছাড়াই দেশে আসা এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারে রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে দেশের কয়েকটি বড় হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি অংশ জড়িত। তাদের সহযোগিতায় চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই চক্রের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে নাম এসেছে মাসুদুর রহমানের। তিনি হার্টের রিং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দ্য স্পন্দন লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত এবং একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এর বাইরে তিনি নিজস্ব নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে হৃদরোগের সরঞ্জামের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—রিদম মেডিকেল ইন্টারন্যাশনাল, ভারটেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এবং থ্রিএফ ইন্টারন্যাশনাল। এ ছাড়া মেডি গ্রাফিক, স্পেস মেড এন্টারপ্রাইজ, প্রবর্তন সিস্টেমস লিমিটেড ও মেরিল লাইফ সায়েন্স নামের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, চট্টগ্রামের কয়েকটি বড় হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে এই নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পার্কভিউ হাসপাতাল, সিএসসিআর হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক লিমিটেড, চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টার, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এবং অ্যাপোলো ইমপেরিয়াল হাসপাতালের নাম এসেছে অভিযোগের তালিকায়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কিছু হৃদরোগ চিকিৎসা সরঞ্জামের উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত কয়েক মাসে ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বৈধ আমদানি ও কর পরিশোধের নথি পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি স্টেন্ট ব্যবহারের বিপরীতে চিকিৎসকদের কমিশন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টদের দাবি, একটি স্টেন্টে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, রোগীকে কোন ধরনের স্টেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানের তৈরি এবং এর বিস্তারিত তথ্য জানানো প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারের পর সরঞ্জামের প্যাকেট ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র রোগীর স্বজনদের দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর পরিবারকে এসব তথ্য দেওয়া হয় না। ফলে রোগী ও স্বজনরা জানতে পারেন না, শরীরে কোন ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে। অনুসন্ধানে এমন অন্তত ৫০ জন রোগীর তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে, যাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জামের বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, রাজধানীতে নজরদারি বাড়ায় এই চক্র এখন চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। অভিযোগের বিষয়ে মাসুদুর রহমান বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিবন্ধন নেই এবং তিনি দ্য স্পন্দন লিমিটেডের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করেন। অবৈধ সরঞ্জাম আমদানির বিষয়টি তার জানা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হতে পারে। তার কাজ শুধু হাসপাতালে সরঞ্জাম সরবরাহ করা। তবে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সরবরাহ করা পণ্যের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

