দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় ভরসার প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে। আগামী আগস্টে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য থাকলেও উৎপাদনের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে প্রকল্পটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার ক্ষেত্রে শুধু জ্বালানি স্থাপন বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করাই সফলতার মাপকাঠি নয়। দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পরিচালনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাশিয়ার আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় নির্মিত দেশের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করছে রাশিয়া। ২৮ বছরে ঋণ পরিশোধের শর্তে দেওয়া এই ঋণের আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে প্রয়োজন হবে বড় পরিমাণ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ резерв বা ‘স্পিনিং রিজার্ভ’। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকস্মিক সমস্যা বা চাহিদা বেড়ে গেলে গ্রিডের ভারসাম্য ধরে রাখতে এই অতিরিক্ত সক্ষমতা সবসময় প্রস্তুত রাখতে হয়।
রাশিয়ার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসটিসি ইউপিএস জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কমপক্ষে ২ হাজার ২১০ মেগাওয়াট স্পিনিং রিজার্ভ রাখার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে প্রাথমিক ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৩৬৭ মেগাওয়াট এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণের জন্য ৮৪৩ মেগাওয়াট резерв প্রয়োজন হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরের নিরাপদ পরিচালনার জন্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সমপরিমাণ সক্ষমতা প্রয়োজন হতে পারে। তবে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় অতিরিক্ত ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করাও কঠিন।
একজন পেট্রোবাংলা কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলে দেশের শিল্পসহ অন্যান্য খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হলো ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুল্লির কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতি দেড় থেকে দুই বছর পরপর এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পরিবর্তন করতে হয়। ব্যবহৃত এই জ্বালানি অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় এবং মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক প্রকৌশল বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রূপপুরে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হলেও ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়া, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বা দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি এবং প্রস্তাবিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন নিয়েও কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম কত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। পারমাণবিক বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ গ্যাস বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সহজ নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঋণের কিস্তি, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ এবং কেন্দ্র বন্ধ করার সময়ের ব্যয়সহ দীর্ঘমেয়াদি বিষয় বিবেচনায় নিয়েই বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, যারা এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ কিনবে, তারাও এখনো সম্ভাব্য বিদ্যুৎ মূল্য সম্পর্কে নিশ্চিত নয়।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) একটি প্রতিবেদনে রূপপুর কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি, বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি বাধ্যতামূলক অ-পারমাণবিক পরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়ার বিষয়ও উঠে এসেছে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণের শেষ ধাপে পরীক্ষার সময় ছোটখাটো ত্রুটি ধরা পড়া স্বাভাবিক। এসব সমস্যা সমাধানের পরই উৎপাদন পর্যায়ে যাওয়া হবে।
রূপপুর প্রকল্প দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক ঋণনির্ভর প্রকল্প। মোট ব্যয় প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে প্রায় ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে।
তবে রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থ লেনদেনে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ার পাওনা অর্থ সোনালী ব্যাংকের বিশেষ হিসাবে জমা রাখা হচ্ছে। কিন্তু সুইফট ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতার কারণে অর্থ সরাসরি পাঠানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি বাংলাদেশের অনিচ্ছার কারণে নয়, বরং রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক লেনদেন সমস্যার কারণে তৈরি হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প নিরীক্ষা অধিদপ্তর (এফএপিএডি) গত নয় অর্থবছরের বিশেষ নিরীক্ষায় প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অনিয়মের আপত্তি জানিয়েছে। এ সময়ে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা।
নিরীক্ষায় ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ২৩০টি আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে ১২০টি আপত্তি ছিল রাশিয়ার নাগরিকদের জন্য নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্প ঘিরে।
প্রকল্পের শুরু হয় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে। দুটি ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পের প্রাথমিক সমাপ্তির সময় ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর। পরে তা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় প্রথমে ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা পরে ২২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাশিয়া যেমন পারমাণবিক প্রযুক্তির বড় শক্তি, তেমনি দুর্নীতির সূচকেও বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে নিরাপদ পরিচালনা, স্বচ্ছতা, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার ওপর।
বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—রূপপুর কি বাংলাদেশের জন্য উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলবে, নাকি অব্যবস্থাপনার কারণে হয়ে উঠবে বড় আর্থিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ?

