লজিস্টিকস খাতকে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল খাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা। তিনি বলেছেন, এই খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দিতে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।
তার অভিযোগ, বর্তমানে কিছু বিদেশি প্রতিষ্ঠান দেশে দৃশ্যমান অবকাঠামো বা প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ না করেই বিভিন্ন নথি, বিশেষ করে বিল অব লেডিংসহ অন্যান্য কাগজপত্র ইস্যুর মাধ্যমে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে লজিস্টিকস খাতে বিদেশি মালিকানা ও কার্যক্রম নতুন করে যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) আয়োজিত ‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন ফজলে হুদা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের বিপক্ষে নয়। তবে সেই বিনিয়োগ দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে। রেল যোগাযোগ, কোল্ড চেইন, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, রেফ্রিজারেটেড ট্রাক এবং কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মতো খাতে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। তবে শুধু কাগজপত্র ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের সুযোগ সীমিত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফজলে হুদা বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই লজিস্টিকস খাতে বিদেশি মালিকানার ওপর নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কায় স্থানীয় মালিকানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং ভারতে মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থাপনায় কঠোর আইন চালু আছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় কার্যকর নীতি প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, লজিস্টিকস খাত শুধু ব্যবসার বিষয় নয়, এর সঙ্গে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত। তাই সেনাবাহিনী বা বন্দর ব্যবস্থাপনার মতো এ খাতকেও কৌশলগত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।
নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, লজিস্টিকস খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীদের মতামত ছাড়া কার্যকর নীতি প্রণয়ন সম্ভব নয়। শুধু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এই খাতের জন্য সঠিক কাঠামো তৈরি করা কঠিন।
ফজলে হুদার দাবি, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিপুল অর্থ দেশের বাইরে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি স্থানান্তর বা দক্ষতা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান দেখা যায় না। অন্যদিকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও শিল্প বিকাশে ভূমিকা রাখছে। তাই তাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বিদেশি মালিকানার আড়ালে নামমাত্র স্থানীয় অংশীদার দেখিয়ে ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দেন। এ ধরনের কৃত্রিম অংশীদারিত্ব তৈরিতে আইনজীবী, পরামর্শক বা হিসাব পেশাজীবীদের ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করার আহ্বান জানান তিনি।
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, দেশের ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্সি, সিঅ্যান্ডএফ এবং কুরিয়ার খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় আইন ও নীতিমালার সংস্কার প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশি মালিকানার কারণে তৈরি হওয়া প্রতিযোগিতাগত বৈষম্য দূর করে একটি শক্তিশালী ও টেকসই লজিস্টিকস খাত গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
অনলাইনে যুক্ত হয়ে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, দ্য ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সভাপতি কবির আহমেদ, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সাবেক সভাপতি মাহমুদ হোসেন এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সাবেক সভাপতি এ টি এম আজিজুল হক (ডেভিড)।

