কক্সবাজারের রামু উপজেলায় ঘর ভেঙে পড়ার পরও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে চার বোন। দারিদ্র্য, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর প্রকৃতির আঘাত—সব মিলিয়ে পরিবারটির জীবন এখন কঠিন এক পরীক্ষার মুখে, তবু মেয়েদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ এতটুকু কমেনি।
রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নে বাস করেন রোকেয়া বেগম ও দিল মোহাম্মদ দম্পতি। জন্মের পর থেকেই একটি চোখে দৃষ্টিশক্তি নেই রোকেয়ার। বয়স এখন ৪০ বছরের কাছাকাছি। তাঁর স্বামী দিল মোহাম্মদের বয়স ৬৭ বছর। এক সময় অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। পাঁচ বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানোর পর থেকে তিনি আর স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে রোকেয়ার কাঁধে।
গত ৪ জুলাই থেকে টানা প্রায় দশ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। এতে রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ২৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়, ক্ষতির মুখে পড়েন প্রায় সত্তর হাজার মানুষ। সেই দুর্যোগেই সরকারি খাসজমিতে তৈরি রোকেয়া বেগমের মাটির ঘরের তিন দিকের দেয়াল ধসে পড়ে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ঘরের অবস্থা এখনো বেহাল। ছেঁড়া পলিথিন দিয়ে কোনোরকমে ছাউনি দেওয়া হয়েছে, তবে বৃষ্টি হলেই পানি চুইয়ে পড়ে ভেতরে। ভেজা কাপড়, বই-খাতা আর সামান্য কিছু আসবাব একসঙ্গে গাদাগাদি করে রাখতে হচ্ছে। রান্নার জন্য শুকনো জায়গাটুকুও নেই। বৃষ্টি একটু কমলেই মেয়েরা উঠানে পলিথিন বিছিয়ে বসে পড়ার চেষ্টা করে।
পরিবারে মোট ছয় মেয়ে থাকলেও বড় দুজনের বিয়ে হয়ে গেছে, তাঁরা আলাদা সংসার করছেন। বাকি চার মেয়ে এখনো মা-বাবার সঙ্গেই থাকে এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। বড় মেয়ে উম্মে হাবিবা স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। এরপর উম্মে সালমার বয়স নয় বছর, সে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। জান্নাতুল মাওয়ার বয়স ছয়, সে নার্সারিতে পড়ে। সবচেয়ে ছোট মেয়ে আঁখি আক্তারের বয়স মাত্র চার বছর।
সংসারের প্রধান আয়ের উৎস রোকেয়া নিজেই। তিনি অন্যের জমিতে কাজ করে দৈনিক পাঁচশ টাকার মতো আয় করেন, আর সেই সামান্য টাকা দিয়েই চলে সংসার ও মেয়েদের পড়াশোনার খরচ। তবে চলতি মাসে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বন্যার পর তাঁদের পাঁচ কেজি চাল, ডাল, তেল, আলু ও পেঁয়াজের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কিছু ব্যক্তি উদ্যোগে সহায়তাও এসেছে। কিন্তু এই সহায়তা দিয়ে স্থায়ী একটি বাসস্থান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রোকেয়া।
মেয়েদের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রোকেয়া। নিজের চোখের সমস্যা নিয়ে তাঁর তেমন আক্ষেপ নেই, তবে মা হিসেবে সন্তানদের দুর্দশা সহ্য করা কঠিন বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, মেয়েরা নিজেরাই পড়তে চায়, কিন্তু প্রয়োজনীয় বই কেনার সামর্থ্যও তাঁর নেই। এতে নিজেকে অসহায় মনে হয় বলে জানান তিনি। স্বামী দিল মোহাম্মদও একই কষ্টের কথা বলেন—শারীরিক অক্ষমতার কারণে বাবা হিসেবে মেয়েদের জন্য তেমন কিছু করতে না পারার যন্ত্রণা তাঁকে পীড়া দেয়।
বিষয়টি জানতে চাইলে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান জানান, পরিবারটির খোঁজখবর ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা চালু করা, নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা এবং মেয়েদের শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। দ্রুতই একটি সমাধানের প্রত্যাশা করছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্যোগ-উত্তর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ নয়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা কাঠামো জরুরি। শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও আর্থিক সংকটে সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়, বিশেষ করে যেসব পরিবারে একজনের আয়ের ওপর পুরো সংসার নির্ভরশীল। রোকেয়া বেগমের পরিবারের ঘটনা সেই বাস্তবতারই একটি প্রতিচ্ছবি, যেখানে দুর্যোগ, দারিদ্র্য ও প্রতিবন্ধকতা একসঙ্গে এসে একটি পরিবারের ভবিষ্যতের ওপর প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয়।

