হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে শুরু থেকেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের দরপত্রে এমন একটি বিশেষ শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল, যার কারণে অংশগ্রহণকারী ২২টি আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টিই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যায় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া এই মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের শুরুতেই এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৮ সালে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র বিক্রি করা হলে ২২টি আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখায়। তবে দরপত্রে যুক্ত করা একটি বিশেষ প্রযুক্তিগত শর্তের কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই আর প্রতিযোগিতায় থাকতে পারেনি।
দরপত্রের ওই শর্তে বলা হয়েছিল, টার্মিনালের মূল ভিত্তি (ফাউন্ডেশন) স্থাপনে ব্যবহার করতে হবে স্ক্রুড স্টিল পাইল (এসএস পাইল) প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা থাকাকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের মাটির জন্য ছিল না উপযোগী প্রযুক্তি?
স্ক্রুড স্টিল পাইলিং হলো অবকাঠামোর ভিত্তি নির্মাণের একটি আধুনিক পদ্ধতি। এতে ইস্পাতের তৈরি পাইল স্ক্রুর মতো ঘুরিয়ে শক্ত মাটি বা শিলার গভীরে স্থাপন করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির ভূ-প্রকৃতিতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার খুব সীমিত এবং থার্ড টার্মিনালের মতো প্রকল্পে এটি প্রয়োজনীয়ও ছিল না।
দরপত্রের এই বিশেষ শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গাপ ইনশাত। পাশাপাশি সরকারি ক্রয় কারিগরি ইউনিটও এক চিঠিতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (সিভিল এভিয়েশন) জানিয়েছিল, এ ধরনের শর্ত দরপত্রে প্রতিযোগিতা সীমিত করছে, যা সরকারি ক্রয়নীতি ও জাইকার নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে এসব আপত্তির পরও শর্ত পরিবর্তন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন কোইয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি এর আগে মেট্রোরেল প্রকল্পে মাটি পরীক্ষা করে জানিয়েছিল, বাংলাদেশের মাটি এসএস পাইল প্রযুক্তির জন্য উপযুক্ত নয়।
প্রশ্ন উঠেছে, একই বাস্তবতা জানা থাকার পরও কেন থার্ড টার্মিনালের দরপত্রে এই প্রযুক্তিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
নথি অনুযায়ী, দরপত্র কেনা ২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব জমা দেয়। এর একটি ছিল শিমিজু জয়েন্ট ভেঞ্চার। অন্যটি ছিল মিতসুবিশি, ফুজিতা ও স্যামসাংয়ের যৌথ উদ্যোগে গঠিত এডিসি। যদিও এডিসি নামে কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি দরপত্র কেনেনি।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে সিভিল এভিয়েশন ও এডিসির মধ্যে নির্মাণ চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তিতে বিতর্কিত এসএস পাইলিং প্রযুক্তির বিষয়টি রাখা হয়েছিল।
পাইলিং পরিবর্তনেই খরচ বাড়ে শত কোটি টাকা
অভিযোগ রয়েছে, চুক্তির কয়েক মাস আগেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিপ্পন কোই সিভিল এভিয়েশনকে জানিয়েছিল, বাংলাদেশের মাটিতে এসএস পাইল কার্যকর নয়। কিন্তু চুক্তি থেকে এই প্রযুক্তি বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসএস পাইলিং কার্যকর হবে না জেনেও চুক্তিতে তা রাখা হয়েছিল এবং এর ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর্থিক সুবিধা পেয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কয়েকটি আর্থিক বিষয়ের মধ্যে রয়েছে—
- পাইলিং পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডিসিকে প্রায় ২৩২ কোটি টাকা দেওয়া হয়।
- বোর পাইলিং ব্যবহারে ব্যয় কমে যায় ৭০০ কোটি টাকার বেশি, যার পূর্ণ হিসাব পাওয়া যায়নি।
- সাশ্রয় হওয়া অর্থের প্রায় ১৬ শতাংশ হিসেবে আরও প্রায় ১২৫ কোটি টাকা এডিসিকে দেওয়া হয়।
‘জেনে-বুঝেই করা হয়েছে’—টিআইবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রথমে একটি বিশেষ শর্ত যুক্ত করা হয়, পরে বলা হয় সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না। আবার কাজ না হলেও ঠিকাদারকে অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। তার মতে, এখানে বড় ধরনের দুর্নীতির আশঙ্কা রয়েছে।
চুক্তির কিছু শর্ত নিয়েও প্রশ্ন
বিশেষ নিরীক্ষায় সিভিল এভিয়েশন ও এডিসির চুক্তিতে থাকা কয়েকটি শর্ত নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ভ্যালু ইঞ্জিনিয়ারিং, মুভ-আপ কস্ট ও ওমিশন কস্টের মতো বিষয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রকল্পে এর আগে এমন শর্তের ব্যবহার দেখা যায়নি। এসব ব্যবস্থার কারণে প্রকল্প ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ প্রকল্পের ব্যয় বাড়লেও ঠিকাদারের লাভ, আবার ব্যয় কমলেও ঠিকাদারের লাভ—এমন কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল বলে প্রশ্ন তুলেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাকসুদুল ইসলাম। এছাড়া উপপরিচালক নূর উদ্দিন, চিফ ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মালেক, জাকারিয়া হোসেন, নাসিম আল ইসলামসহ অনেকে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সার্বিক তদারকিতে ছিলেন সিভিল এভিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান।
তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মকর্তাদের কয়েকজন এখনো টার্মিনাল পরিচালনা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও অধিকাংশই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। শুধু সাবেক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমানের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক অডিটের উদ্যোগ
থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগের বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, প্রকল্পটি আগের সরকারের সময়ে নেওয়া হলেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি জানান, প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় যাচাই করতে আন্তর্জাতিক অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

