|
আওয়ামী লীগের সাবেক বর্ষীয়ান নেতা ও প্রাক্তন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাঁকে নিয়ে দলের কিছু কর্মী-সমর্থকের প্রশংসাসূচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও, মুক্তিযুদ্ধপন্থী ও সচেতন অনেক নাগরিক এর সমালোচনা করছেন। তাঁদের মতে, ইতিহাস ভুলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দলটির হঠাৎ তাঁর প্রতি এই সহানুভূতি প্রকাশ একধরনের দ্বিচারিতা।
মূলত ২০১৪ সালের ঘটনার স্মৃতিচারণকে কেন্দ্র করে তৈরি এই রাজনৈতিক প্রতিবেদনে লতিফ সিদ্দিকীর অবস্থান, আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।
নিউইয়র্কের সেই আলোচিত বক্তব্য ও আওয়ামী লীগের অবস্থান
২০১৪ সালে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন লতিফ সিদ্দিকী। সেখানে তিনি হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিভিত্তিক মন্তব্য করেন।
তিনি বলেছিলেন, প্রতিবছর হজ পালনের পেছনে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, যা দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ করা হলে অর্থনৈতিকভাবে দেশ আরও লাভবান হতে পারত। পাশাপাশি তাবলিগ জামাত সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন, কেবল পরকাল নিয়ে কথা না বলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিয়েও তাদের কথা বলা উচিত।
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর তৎকালীন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে হেফাজতে ইসলাম, তীব্র প্রতিবাদ শুরু করে। তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং দল থেকে বহিষ্কারের দাবিতে ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
দল থেকে অসংবেদনশীল প্রস্থান ও শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত
বিভিন্ন চাপের মুখেও প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ নিজের বক্তব্যে অনড় থাকেন এবং কোনো ধরনের ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি কোনো ভুল কথা বলেননি।
তবে সেই সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক আদর্শের চর্চা না করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা হেফাজত ও অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীকে তুষ্ট করার পথ বেছে নিয়েছিলেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একটি অংশ। লতিফ সিদ্দিকীর পাশে না দাঁড়িয়ে বরং তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয় দলটি।
- মন্ত্রীত্ব প্রত্যাহার: তাঁকে দ্রুত মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়।
- দল থেকে বহিষ্কার: দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যপদ তো বটেই, এমনকি দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।
- এমপি পদ ত্যাগ: জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার নির্দেশে তাঁকে সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়।
সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে দেওয়া নিজের শেষ ১৫ মিনিটের ভাষণে লতিফ সিদ্দিকী অশ্রুসিক্ত হলেও রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে আসেননি। তিনি বলেছিলেন,
“দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সংসদ সদস্যপদ ছাড়লাম… কর্মী হিসেবে নেতার একান্ত অনুগত ছিলাম।”
এমনকি চূড়ান্ত অপমান ও সবকিছু হারিয়েও তিনি তাঁর মূল বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি। তিনি আরও বলেছিলেন,
“আমি মুসলমান, আমি বাঙালি, আমি আওয়ামী লীগার। এ পরিচয় মুছে দেওয়ার মতো শক্তি পৃথিবীতে আর কারও নেই… আমি মানুষ বলেই আমার ভুলভ্রান্তি আছে, কিন্তু মনুষ্যত্বের স্খলন নেই।”
— আবদুল লতিফ সিদ্দিকী (সংসদে তাঁর শেষ ভাষণ)
ধর্মান্ধতার তোষণ ও পরিণতি
লতিফ সিদ্দিকীকে বলির পাঁঠা বানানোর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ মূলত ধর্মীয় চরমপন্থীদের কাছে নতি স্বীকারের সূচনা করেছিল বলে মনে করা হয়। এর পর থেকে ক্রমান্বয়ে দলটি হেফাজত ও অন্যান্য মৌলবাদী শক্তির বিভিন্ন দাবি মেনে নিতে শুরু করে। পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন থেকে শুরু করে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতিসহ নানা রাজনৈতিক সমীকরণে দলটি নিজেদের অসাম্প্রদায়িক অবস্থান থেকে দূরে সরে যায়।
লতিফ সিদ্দিকী সেদিন সতর্ক করে বলেছিলেন,
“দেশটাকে আঁধার গ্রাস করেছে।”
আজকের প্রেক্ষাপট ও প্রবীণ এই নেতার লড়াই
২০১৪ সালে প্রবীণ ও অসাম্প্রদায়িক এই মুক্তিযোদ্ধা একা যে মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন, এক দশক পর পুরো বাংলাদেশ আজ সেই একই সংকটের মুখোমুখি। রাজনীতিতে ধর্মান্ধতার তোষণ কীভাবে একটি ঐতিহ্যবাহী দলকে আদর্শচ্যুত করে এবং পুরো রাষ্ট্রকে সংকটে ফেলে, লতিফ সিদ্দিকীর রাজনৈতিক ট্র্যাজেডিকে অনেকে তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
আজ ৯০ বছর বয়সেও যখন তিনি নিজের বিশ্বাসে অটল থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন, তখন আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি অংশের নতুন করে তাঁর প্রশংসা করাকে অনেকেই আত্মসমালোচনার বিষয় বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ যদি এই বর্ষীয়ান নেতার পাশে দাঁড়াত এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে আপস না করত, তবে আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা হয়তো এতটা সংকটময় হয়ে উঠত না।

