বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে একটি চাকরির বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জন আবেদন করছেন। অথচ করোনা মহামারির আগে একই পদে গড়ে আবেদনকারী ছিলেন ১৭৩ জন। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে চাকরির প্রতিযোগিতা প্রায় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নিয়োগ কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে চাকরিপ্রার্থীদের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন চাকরি পাওয়া আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।
গবেষণাটি দেশের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন চাকরির প্ল্যাটফর্মের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। এতে ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৪৭ সপ্তাহের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক আতনু রব্বানী।
গবেষণায় চাকরির বিজ্ঞাপন, শূন্যপদের সংখ্যা, আবেদনকারীর হার এবং শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার মাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে করোনা মহামারি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সুদের হার পরিবর্তনের মতো বড় অর্থনৈতিক ঘটনাগুলোর প্রভাবও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, বিশ্লেষণকৃত সময়ে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১ হাজার ১৫৪টি চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিজ্ঞাপনে মোট শূন্যপদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৪৬টি। অন্যদিকে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৬ লাখ ৯৭ হাজার চাকরির আবেদন জমা পড়েছে, যা দেশের চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
করোনা মহামারির সময় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি সংকটজনক হয়ে ওঠে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুনের মধ্যে দেশব্যাপী বিধিনিষেধ চলাকালে চাকরির বিজ্ঞাপন ৭০ দশমিক ২ শতাংশ এবং শূন্যপদের সংখ্যা ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে চাকরির আবেদনও কমেছিল, তবে তার হার ছিল ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ চাকরির সুযোগ যত দ্রুত কমেছে, চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা ততটা কমেনি। এই ব্যবধানই একটি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা ২৮৭ জনে পৌঁছে দেয়।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে একই সময়ে চাকরির শূন্যপদ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছিল। আর যুক্তরাজ্যে এই হার ছিল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। তবে বাংলাদেশে নিয়োগে যে ধাক্কা লেগেছিল, তার প্রভাব তুলনামূলক দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয়েছে।
করোনার পর নিয়োগ কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও শ্রমবাজার এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে ফিরতে পারেনি। গবেষকদের মতে, শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতার এই সূচক দেখায় একটি শূন্যপদের জন্য কতজন মানুষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই সংখ্যা যত বাড়ে, চাকরি পাওয়া তত কঠিন হয়ে ওঠে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, অনলাইন চাকরির তথ্য নীতিনির্ধারকদের জন্য দ্রুত সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। কারণ প্রচলিত শ্রমশক্তি জরিপ সাধারণত তিন মাস বা তারও বেশি সময় পর প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে অনলাইন চাকরির তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ হওয়ায় শ্রমবাজারে হঠাৎ পরিবর্তন অনেক দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
তবে গবেষকরা মনে করেন, অনলাইন তথ্য কখনোই সরকারি জরিপের বিকল্প হতে পারে না। কারণ এসব তথ্য মূলত শহরভিত্তিক, আনুষ্ঠানিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের চিত্র তুলে ধরে। তাই বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নে উভয় ধরনের তথ্যই সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সুদের হার পরিবর্তনের প্রভাব নিয়োগে খুব বেশি স্থায়ী হয়নি। সুদের হার বাড়ানোর পর কিছু সময়ের জন্য চাকরির বিজ্ঞাপন কমলেও এক সপ্তাহের মধ্যেই সেই প্রভাব অনেকটা মিলিয়ে যায়। অর্থাৎ নিয়োগের সিদ্ধান্তে সুদের হার একমাত্র বা প্রধান নিয়ামক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ, নতুন শিল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে চাকরির বাজারে এই বাড়তি চাপ কমানো সম্ভব। অন্যথায় প্রতি বছর শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়া বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

