Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice রবি, আগস্ট 2, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » সরকারি সেবায় ঘুষ কেন এখন নিয়ম হয়ে উঠছে?
    বাংলাদেশ

    সরকারি সেবায় ঘুষ কেন এখন নিয়ম হয়ে উঠছে?

    নিউজ ডেস্কআগস্ট 1, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবছর সরকারকে বিভিন্ন ধরনের কর দেন। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর, শুল্ক ও নানা সরকারি ফি থেকে সংগৃহীত অর্থ জাতীয় বাজেটে যুক্ত হয়। এই অর্থ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, আইনশৃঙ্খলা এবং অন্যান্য সরকারি সেবা পরিচালিত হওয়ার কথা।

    কিন্তু এর পাশাপাশি দেশের লাখ লাখ মানুষকে আরও একটি কর দিতে হচ্ছে, যার কোনো উল্লেখ জাতীয় বাজেটে নেই। এর কোনো বৈধ রসিদও দেওয়া হয় না। সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না হয়ে চলে যায় অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে।

    এই অঘোষিত অর্থের নাম ঘুষ।

    সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও নাগরিকদের পাসপোর্ট, যানবাহনের কাগজপত্র, ভূমির নথি, চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষিসেবা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সহায়তা পেতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রকে নিয়মিত কর দেওয়ার পরও নাগরিকরা একই সেবার জন্য দ্বিতীয়বার অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

    ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২৫ সালের জাতীয় খানা জরিপে এই অদৃশ্য অর্থনীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের পরিবারগুলো সরকারি ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ঘুষ হিসেবে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ দশমিক ২ কোটি টাকা দিয়েছে।

    এই অর্থ ২০২৪–২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ০ দশমিক ২৩ শতাংশের সমান।

    সংখ্যাটি শুধু দুর্নীতির পরিমাণ নির্দেশ করে না। এটি এমন একটি সমান্তরাল অর্থব্যবস্থার উপস্থিতি তুলে ধরে, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়মের পাশাপাশি আরেকটি অলিখিত নিয়ম কাজ করছে। সেই ব্যবস্থায় নাগরিকের অধিকার, প্রয়োজন কিংবা আইনগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার সক্ষমতা।

    ঘুষের টাকায় তৈরি অঘোষিত অর্থনীতি

    ১২ হাজার ৬৩৩ দশমিক ২ কোটি টাকা কোনো ছোট অঙ্ক নয়। এই অর্থ মানুষের বৈধ আয় থেকে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বা জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয়নি।

    একজন সাধারণ নাগরিক যখন সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দেন, তখন সেই অর্থ তার পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান কিংবা সঞ্চয়ের বাজেট থেকে কেটে নেওয়া হয়। এভাবে প্রতিটি ঘুষের ঘটনা শুধু একজন নাগরিককে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও দুর্বল করে।

    ঘুষের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ সাধারণত কোনো উৎপাদনশীল খাতে যায় না। এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না, অবকাঠামো নির্মাণ করে না এবং জনসেবার মানও বাড়ায় না। বরং এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অনৈতিক উপার্জনের সুযোগ তৈরি করে এবং সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও নিরুৎসাহিত করে।

    ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জরিপটি দেশের আটটি বিভাগের ১৫ হাজার ৭১৫টি পরিবারের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। জরিপের ফল বলছে, ২০২৫ সালে অন্তত একটি সরকারি বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নিতে গিয়ে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে।

    একই সময়ে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার সরাসরি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে।

    ২০২৩ সালের আগের জরিপের তুলনায় দুর্নীতির শিকার পরিবারের হার ১৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘুষ দেওয়ার ঘটনা বেড়েছে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ।

    অর্থাৎ, দুর্নীতির বিস্তার শুধু অব্যাহত নেই; এটি আরও দ্রুতগতিতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করছে।

    পাসপোর্ট ও সড়ক পরিবহন সেবায় দুর্নীতির চাপ বেশি

    জরিপে পাসপোর্ট সেবা এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে।

    পাসপোর্ট একজন নাগরিকের বৈধ পরিচয় ও বিদেশ ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একইভাবে যানবাহনের নিবন্ধন, চালকের অনুমতিপত্র এবং অন্যান্য সড়ক পরিবহনসংক্রান্ত সেবা আইনসম্মতভাবে পাওয়ার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে।

    কিন্তু এসব সেবা নিতে গিয়ে যখন দালাল, অতিরিক্ত অর্থ এবং অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের প্রয়োজন হয়, তখন সরকারি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

    সরকারি ফি পরিশোধের পরও যদি একজন নাগরিককে ফাইল এগিয়ে নেওয়া, ভুল সংশোধন করা, নির্ধারিত সময়ে সেবা পাওয়া কিংবা হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়, তাহলে সেটি আর বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি থাকে না। এটি একটি বিকল্প মূল্যব্যবস্থায় পরিণত হয়।

    এই ব্যবস্থায় সেবার মূল্য সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে শেষ হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দালালের টাকা, কর্মকর্তার দাবি এবং দ্রুত কাজ করানোর অনানুষ্ঠানিক ব্যয়।

    দুর্নীতি এখন ব্যতিক্রম নয়, প্রক্রিয়ার অংশ

    জরিপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অধিকাংশ পরিবার ঘুষ দেওয়াকে স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেনি। ঘুষ দেওয়া পরিবারগুলোর ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের সামনে অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প ছিল না।

    ৯১ শতাংশের বেশি পরিবার বলেছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা সরাসরি অবৈধ অর্থ আদায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

    অন্যদিকে ৮১ শতাংশের বেশি পরিবার মনে করে, অতিরিক্ত অর্থ না দিলে প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা পাওয়া সম্ভব নয়।

    ঘুষ দেওয়ার কারণ সম্পর্কে ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের বক্তব্য ছিল আরও সরাসরি। তারা জানিয়েছে, সেবা পেতে হলে অর্থ দেওয়া এড়ানোর কোনো সুযোগ ছিল না।

    এই পরিসংখ্যান দেখায়, দুর্নীতি এখন শুধু কয়েকজন অসৎ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক ক্ষেত্রে এটি সেবা দেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিশে গেছে।

    নাগরিকরা জানেন যে সেবা পাওয়ার আইনগত অধিকার তাদের রয়েছে। তবু তারা বিশ্বাস করেন, ঘুষ না দিলে কাজ আটকে যাবে, ফাইল হারিয়ে যাবে, অপ্রয়োজনীয় ভুল ধরা হবে অথবা বারবার অফিসে ঘুরতে হবে।

    এভাবে সময়ক্ষেপণ এবং হয়রানিকে অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ আদায়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেবা যত বেশি বিলম্বিত হয়, নাগরিকের অসহায়ত্ব তত বাড়ে। একপর্যায়ে তিনি অতিরিক্ত অর্থ দেওয়াকেই দ্রুত সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে মেনে নেন।

    নাগরিককে একই সেবার জন্য দুইবার মূল্য দিতে হচ্ছে

    রাষ্ট্র নাগরিকের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে এই প্রতিশ্রুতিতে যে তাকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হবে। কিন্তু যখন কর দেওয়ার পরও একই সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয়, তখন একজন নাগরিক কার্যত দুইবার মূল্য পরিশোধ করেন।

    প্রথমবার তিনি বৈধভাবে কর, শুল্ক বা সরকারি ফি দেন। দ্বিতীয়বার তাকে অবৈধভাবে কর্মকর্তা, কর্মচারী বা দালালকে অর্থ দিতে হয়।

    এই দ্বিতীয় অর্থের কোনো জবাবদিহি নেই। এর কোনো হিসাব রাষ্ট্রের কাছে থাকে না এবং তা দিয়ে জনকল্যাণমূলক কোনো কাজও হয় না।

    ফলে ঘুষকে শুধু নৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ক্ষতি বোঝা যাবে না। এটি নাগরিকের ওপর আরোপিত একটি অদৃশ্য কর। তবে সাধারণ করের বিপরীতে এই কর ন্যায়সংগত নয় এবং মানুষের আয়ের ওপর সমান প্রভাবও ফেলে না।

    যার আয় কম, তার জন্য পাঁচ হাজার টাকার ঘুষ একটি বড় আর্থিক আঘাত। কিন্তু উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য একই অঙ্ক তুলনামূলকভাবে ছোট ব্যয়। এ কারণেই দুর্নীতির বোঝা সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি পড়ে।

    প্রযুক্তিনির্ভর সেবাও কেন দুর্নীতি ঠেকাতে পারছে না

    সরকারি সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নাগরিক ও কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ কমানো। ধারণা করা হয়েছিল, আবেদন, ফি পরিশোধ, নথি যাচাই এবং সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া প্রযুক্তিনির্ভর হলে দালাল ও ঘুষের সুযোগ কমবে।

    কিন্তু জরিপের ফল দেখায়, শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই দুর্নীতি শেষ হয় না।

    অনেক সেবা আংশিকভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হলেও গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো এখনো কর্মকর্তাদের হাতে থাকে। আবেদন অনলাইনে জমা দেওয়া গেলেও নথি যাচাই, অনুমোদন, সংশোধন এবং সেবা হস্তান্তরের সময় নাগরিককে আবারও সরকারি দপ্তরে যেতে হয়।

    এই মিশ্র ব্যবস্থায় দালাল ও অসাধু কর্মকর্তারা নতুন উপায়ে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখেন। কোথাও অনলাইন আবেদন ভুল দেখানো হয়, কোথাও প্রয়োজনীয় নথি অসম্পূর্ণ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, আবার কোথাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না দিয়ে নাগরিককে অনানুষ্ঠানিক পথে যেতে বাধ্য করা হয়।

    ফলে প্রযুক্তি দুর্নীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ না করে অনেক ক্ষেত্রে শুধু তার ধরন পরিবর্তন করেছে।

    সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রতিটি ধাপের স্বচ্ছতা, কাজ শেষ করার নির্দিষ্ট সময়সীমা, কর্মকর্তার দায়িত্ব নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় তদারকি প্রয়োজন।

    নাগরিক যেন আবেদন করার পর প্রতিটি ধাপের অবস্থা দেখতে পারেন এবং অযৌক্তিক বিলম্ব হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তদন্ত শুরু হয়—এমন ব্যবস্থা না থাকলে শুধু অনলাইন আবেদন দুর্নীতি কমাতে যথেষ্ট হবে না।

    গরিব মানুষই দিচ্ছেন সবচেয়ে বেশি মূল্য

    জরিপে দেখা গেছে, দুর্নীতি সমাজের সব শ্রেণিকে প্রভাবিত করলেও নিম্ন আয়ের পরিবার, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি।

    ধনী পরিবারের জন্য ঘুষ দেওয়া একটি বিরক্তিকর অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের জন্য এটি খাদ্য, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার টাকা হারানোর সমান।

    জরিপের সময় দেশের পরিবারগুলো গড়ে তাদের বার্ষিক আয়ের ১ দশমিক ৭ শতাংশ ঘুষ দিতে ব্যয় করেছে।

    তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়াবহ। সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ পাঁচটি সেবা খাতে তাদের বার্ষিক আয়ের ৫ দশমিক ১ শতাংশ ঘুষে চলে গেছে।

    অন্যদিকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

    অর্থাৎ, যাদের আয় কম, তাদের আয়ের তুলনায় ঘুষের বোঝা বেশি।

    একজন দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা নিম্নবেতনভোগী কর্মচারীর জন্য কয়েক হাজার টাকা ঘুষ দেওয়া মানে মাসের খাবারের খরচ কমিয়ে দেওয়া, ঋণ নেওয়া অথবা জরুরি চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া।

    পাসপোর্ট পেতে মাসিক আয়ের ৭৮ শতাংশ ব্যয়

    নির্দিষ্ট কিছু সেবায় দরিদ্র পরিবারের ওপর ঘুষের চাপ আরও ভয়াবহ।

    জরিপ অনুযায়ী, পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো গড়ে তাদের এক মাসের আয়ের ৭৮ শতাংশ ব্যয় করেছে। শুধু ঘুষ দিতেই তাদের মাসিক আয়ের ৩৭ শতাংশ চলে গেছে।

    একটি পরিবারের মাসিক আয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি যদি একটি সরকারি সেবার ঘুষে চলে যায়, তাহলে সেই পরিবারকে অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতেই হবে।

    অনেকে বিদেশে চাকরি, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার জন্য পাসপোর্টের আবেদন করেন। বিশেষ করে বিদেশে কাজের সুযোগ খুঁজতে যাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পাসপোর্ট বিলাসিতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ আয়ের একটি সম্ভাব্য পথ।

    কিন্তু সেই প্রয়োজনীয় দলিল পেতে যদি ঘুষ দিতে হয়, তাহলে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ শুরুতেই বৈষম্যের শিকার হন।

    আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে ঘুষের ভয়াবহতা

    আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে পরিবারগুলো গড়ে তাদের মাসিক আয়ের ৩৪ শতাংশ অবৈধ অর্থ হিসেবে দিয়েছে।

    কিছু পরিবার জানিয়েছে, তাদের এক মাসের মোট আয়ের সাড়ে চার গুণেরও বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে।

    আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, জরিপে অন্তর্ভুক্ত ১৩টি পরিবারের দেওয়া মোট ঘুষের পরিমাণ তাদের এক বছরের আয়ের চেয়েও বেশি ছিল। চরম কিছু ক্ষেত্রে ঘুষের পরিমাণ পরিবারের বার্ষিক আয়ের পাঁচ থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

    যে পরিবারের সারা বছরের আয় দিয়ে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর কথা, সেই আয়ের কয়েক গুণ অর্থ যদি ঘুষ হিসেবে দিতে হয়, তাহলে পরিবারটি ঋণগ্রস্ত হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ পায় না।

    তারা জমি বিক্রি করতে পারে, গয়না বন্ধক রাখতে পারে, উচ্চ সুদে ঋণ নিতে পারে অথবা সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে পারে।

    এভাবে দুর্নীতি শুধু একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে অর্থ কেড়ে নেয় না। এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও বদলে দিতে পারে।

    ঘুষ মানুষকে আরও গভীর দারিদ্র্যে ঠেলে দেয়

    প্রতিটি ঘুষের টাকা পরিবারের অন্য কোনো প্রয়োজন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে দুর্নীতির সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনমানের ওপর।

    ঘুষ দিতে গিয়ে পরিবার খাদ্য গ্রহণ কমাতে পারে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিতে পারে, সন্তানের বিদ্যালয়ের খরচ বন্ধ করতে পারে অথবা উৎপাদনশীল কাজে বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাতিল করতে পারে।

    একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি অনুমতি, নিবন্ধন কিংবা সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দেন, তাহলে তার ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যায়। সেই অতিরিক্ত ব্যয় তিনি হয়তো পণ্যের দামে যোগ করেন অথবা ব্যবসা ছোট করে ফেলেন।

    একজন কৃষক যদি কৃষিসেবা, ঋণ, ভর্তুকি বা সরকারি সহায়তা পেতে অর্থ দেন, তাহলে তার উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।

    একজন দরিদ্র রোগী যদি সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যের বা স্বল্পমূল্যের সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দেন, তাহলে তিনি চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে দুর্নীতির ব্যয়ও বহন করেন।

    এই ধারাবাহিক ক্ষতি মানুষের অর্থনৈতিক সহনশীলতা কমিয়ে দেয়। কোনো পরিবার একবার ঘুষ দেওয়ার পর হয়তো আবার সঞ্চয় তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই পরিবার যদি বারবার ছোট ছোট ঘুষ দিতে বাধ্য হয়, তাহলে ধীরে ধীরে তার আর্থিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে।

    ঘুষের অঙ্ক কমলেও ঘটনা বেড়েছে

    জরিপে দেখা গেছে, প্রতিটি পরিবার গড়ে যে পরিমাণ ঘুষ দিয়েছে, তা ২০২৩ সালের ৫ হাজার ৬৮০ টাকা থেকে ২০২৫ সালে ৫ হাজার ১২৪ টাকায় নেমেছে।

    প্রথম দেখায় এটি কিছুটা ইতিবাচক মনে হতে পারে। কিন্তু ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সতর্ক করেছে যে গড় অঙ্ক কমার অর্থ দুর্নীতি কমে যাওয়া নয়।

    বরং ছোট অঙ্কের ঘুষ এখন আরও বেশি মানুষের কাছ থেকে এবং আরও ঘন ঘন নেওয়া হচ্ছে।

    স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষির মতো সেবা খাতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এসব খাতে ঘুষের অঙ্ক তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও ঘটনার সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে।

    এই ছোট ঘুষকে অনেক সময় মানুষ গুরুতর দুর্নীতি হিসেবে দেখেন না। কেউ হয়তো দ্রুত সেবা পেতে দুইশ বা পাঁচশ টাকা দিয়ে দেন। কিন্তু লাখ লাখ মানুষের কাছ থেকে এভাবে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হলে মোট অঙ্ক বিশাল হয়ে দাঁড়ায়।

    এর সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো, ছোট ঘুষ ধীরে ধীরে মানুষের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তখন নাগরিকরা মনে করতে শুরু করেন, সরকারি সেবা পেতে অতিরিক্ত কিছু টাকা দিতেই হবে।

    দুর্নীতির এই সামাজিক স্বীকৃতি বড় ধরনের অনিয়মের জন্যও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

    অভিযোগ করেও সমাধান পান না অধিকাংশ নাগরিক

    দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে নাগরিককে অভিযোগ জানানোর সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর সুযোগ দিতে হয়। কিন্তু জরিপ বলছে, দেশের বড় একটি অংশ জানেই না কোথায় এবং কীভাবে অভিযোগ করতে হবে।

    ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই।

    সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতেন মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার।

    দুর্নীতির অভিজ্ঞতা থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে মাত্র ১০ দশমিক ৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছে।

    অভিযোগকারী পরিবারগুলোর ২১ দশমিক ৬ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। অন্যদিকে ৫১ শতাংশ অভিযোগকারী বলেছেন, তাদের অভিযোগের পর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

    এই পরিস্থিতি নাগরিকের মধ্যে একটি বিপজ্জনক ধারণা তৈরি করে—অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই।

    কেউ যখন সাহস করে দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর পরও প্রতিকার পান না, তখন তিনি ভবিষ্যতে আর অভিযোগ করতে আগ্রহী হন না। তার অভিজ্ঞতা দেখে আশপাশের মানুষও নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।

    এভাবে নীরবতা দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেয় এবং অভিযোগকারী নাগরিক আরও অসহায় হয়ে পড়েন।

    নীরবতা যখন আত্মরক্ষার কৌশল

    অনেক নাগরিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চান না, কারণ তারা হয়রানি, প্রতিশোধ বা সেবা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা করেন।

    সরকারি কার্যালয়ে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পর নাগরিককে যদি আবার সেই একই দপ্তরে সেবা নিতে হয়, তাহলে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। পরিচয় গোপন রাখার নিশ্চয়তা না থাকলে অভিযোগ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

    ফলে নীরবতা অনেক মানুষের কাছে সম্মতির প্রকাশ নয়; এটি বেঁচে থাকার এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার কৌশল।

    এই অবস্থায় দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না। এটি নাগরিকের আত্মমর্যাদা, আইনের প্রতি বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে দুর্বল করে।

    মানুষ যখন মনে করেন আইনগত অধিকার প্রয়োগ করে কোনো ফল পাওয়া যাবে না, তখন তারা নিয়মের বদলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, দালাল এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

    এভাবে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয় এবং ব্যক্তিগত প্রভাবের ক্ষমতা বাড়ে।

    তারেক রহমান সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা

    তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সরকারি প্রতিষ্ঠানে সততা ফিরিয়ে আনা, দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেছে।

    কিন্তু জাতীয় খানা জরিপের ফল দেখায়, সরকারের সামনে থাকা সমস্যা শুধু কয়েকজন কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

    দুর্নীতি যদি সেবা প্রদানের প্রতিটি ধাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে সমাধানও হতে হবে কাঠামোগত।

    শুধু অভিযান চালিয়ে কিছু দালাল আটক করা কিংবা কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করলে সাময়িক পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া যদি জটিল, অস্বচ্ছ এবং কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে নতুন দালাল ও নতুন ঘুষের পথ আবার তৈরি হবে।

    সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো নাগরিককে তার বৈধ অধিকার পেতে ব্যক্তিগত অনুরোধ, পরিচিতি বা অবৈধ অর্থের ওপর নির্ভর করতে হবে না।

    দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা জরুরি

    দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর করতে হলে প্রতিষ্ঠানটির তদন্ত, মামলা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

    রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক পদ, ব্যবসায়িক প্রভাব কিংবা সামাজিক অবস্থান যেন দুর্নীতির তদন্তে কোনো বাধা তৈরি না করে।

    একই সঙ্গে শুধু বড় দুর্নীতির মামলা নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সেবায় ঘটে যাওয়া ঘুষের ঘটনাগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

    জনগণ যদি দেখে ছোট ঘুষের অভিযোগেও দ্রুত তদন্ত হচ্ছে, কর্মকর্তা জবাবদিহির মুখোমুখি হচ্ছেন এবং নাগরিক প্রতিকার পাচ্ছেন, তাহলে অভিযোগ করার আগ্রহ বাড়বে।

    কিন্তু অভিযোগ বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে বা অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবের কারণে রক্ষা পেলে মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।

    প্রতিটি সেবায় সময়সীমা ও প্রকাশ্য হিসাব প্রয়োজন

    দুর্নীতি কমাতে প্রতিটি সরকারি সেবার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা জরুরি।

    কোন সেবার জন্য কত টাকা লাগবে, কোন নথি প্রয়োজন, কত দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে জানাতে হবে।

    নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না দিলে কর্মকর্তাকে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। অযৌক্তিক বিলম্ব হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জানানো প্রয়োজন।

    নাগরিকের আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, কে সেটি দেখছেন এবং কেন আটকে আছে—এসব তথ্য সহজে জানা গেলে দালালের প্রয়োজন কমবে।

    সরকারি কার্যালয়ের সামনে অনুমোদিত ফির তালিকা স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা এবং সব অর্থ গ্রহণে বাধ্যতামূলক রসিদের ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

    নগদ লেনদেন যত কমবে, গোপনে অর্থ আদায়ের সুযোগও তত কমতে পারে। তবে শুধু নগদহীন পদ্ধতি চালু করলেই হবে না; সেবা অনুমোদনের প্রতিটি ধাপও নজরদারির মধ্যে আনতে হবে।

    অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

    দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা সহজ করার পাশাপাশি অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

    মুঠোফোন, সরকারি ওয়েবসাইট, স্থানীয় প্রশাসন এবং নির্ধারিত সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে অভিযোগ করার সুযোগ থাকতে পারে। অভিযোগ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে একটি অনুসরণ নম্বর দিতে হবে, যাতে নাগরিক অগ্রগতি জানতে পারেন।

    কতটি অভিযোগ জমা পড়েছে, কতটি তদন্ত হয়েছে, কতটি প্রমাণিত হয়েছে এবং কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।

    এতে একদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়বে, অন্যদিকে নাগরিক বুঝতে পারবেন যে অভিযোগ করা অর্থহীন নয়।

    দালালচক্র ভাঙতে কর্মকর্তার দায় নির্ধারণ জরুরি

    সরকারি কার্যালয়ের সামনে দালালের উপস্থিতি প্রায়ই দৃশ্যমান হলেও শুধু দালালকে দায়ী করলে মূল সমস্যার সমাধান হবে না।

    দালাল তখনই কার্যকর হয়, যখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তার সহযোগী থাকে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সহায়তা ছাড়া একজন বাইরের ব্যক্তি ফাইল এগিয়ে নেওয়া, কাজ দ্রুত করানো কিংবা নিয়ম পরিবর্তন করার ক্ষমতা পেতে পারে না।

    তাই দালালচক্র ভাঙতে হলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সহযোগীদের চিহ্নিত করতে হবে।

    যে কর্মকর্তার অধীনে বারবার ঘুষের অভিযোগ আসছে, তার সেবা প্রদানের রেকর্ড, সম্পদের পরিবর্তন এবং দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন।

    শুধু বদলি দুর্নীতির শাস্তি হতে পারে না। বদলি করলে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি নতুন কর্মস্থলেও একই কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।

    প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রশাসনিক ও আইনগত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

    ঘুষের অর্থনীতি ভাঙা কেন জরুরি

    ১২ হাজার ৬৩৩ দশমিক ২ কোটি টাকার ঘুষ শুধু নাগরিকের পকেট থেকে নেওয়া অর্থ নয়। এটি দেশের সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সমতা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার জন্য বড় হুমকি।

    দুর্নীতির কারণে দরিদ্র পরিবার আরও দরিদ্র হয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ব্যয় বাড়ে, সরকারি সেবার মান কমে এবং সৎ নাগরিক নিয়ম মানার উৎসাহ হারান।

    যেখানে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া যায় না, সেখানে আইন মেনে চলা মানুষই সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়েন। বিপরীতে অর্থ, পরিচয় ও প্রভাব থাকা ব্যক্তি দ্রুত সুবিধা পান।

    এর ফলে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা দুর্বল হয় এবং সমাজে এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে ন্যায়সংগত পথে কোনো কাজ হয় না।

    একটি দেশের প্রতিষ্ঠান তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন—আইন সবার জন্য সমান, সরকারি সেবা তাদের অধিকার এবং অন্যায়ের অভিযোগ করলে প্রতিকার পাওয়া যাবে।

    বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের আসল লক্ষ্য তাই শুধু ঘুষের মোট অঙ্ক কমানো নয়। লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি সেবাব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কাউকে তার অধিকার কিনতে হবে না।

    বাংলাদেশে ঘুষ এখন আর শুধু গোপনে টাকা লেনদেনের ঘটনা নয়। জরিপের তথ্য বলছে, এটি সরকারি সেবা গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

    ২০২৫ সালে পরিবারগুলোর দেওয়া ১২ হাজার ৬৩৩ দশমিক ২ কোটি টাকার ঘুষ দেখায়, দেশের ভেতরে একটি অঘোষিত অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

    ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের দুর্নীতির অভিজ্ঞতা এবং ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের ঘুষ দেওয়ার তথ্য কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন অনিয়মের চিত্র নয়।

    যখন ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ ঘুষদাতা বলেন যে তাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না, তখন বোঝা যায় সমস্যাটি ব্যক্তিগত সততার সীমা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করেছে।

    তারেক রহমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এই বাধ্যতামূলক ঘুষের ব্যবস্থা ভাঙা। শুধু প্রতিশ্রুতি, অভিযান বা প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করলেই সেই লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

    প্রয়োজন স্বচ্ছ সেবা পদ্ধতি, নির্দিষ্ট সময়সীমা, স্বাধীন তদন্ত, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায় এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃশ্যমান শাস্তি।

    সাধারণ মানুষের কাছে দুর্নীতিবিরোধী সাফল্যের মাপকাঠি কোনো বক্তৃতা কিংবা প্রতিবেদন নয়। তারা পরিবর্তন বুঝবেন তখনই, যখন পাসপোর্ট, ভূমির নথি, যানবাহনের কাগজপত্র, চিকিৎসা কিংবা আইনগত সহায়তা পেতে আর দালাল খুঁজতে হবে না।

    যেদিন নাগরিক নির্ধারিত ফি দিয়ে, নির্ধারিত সময়ে এবং সম্মানের সঙ্গে সরকারি সেবা পাবেন, সেদিনই বলা যাবে ঘুষের অদৃশ্য কর থেকে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে মুক্তির পথে এগিয়েছে।

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    বাংলাদেশ

    এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা

    আগস্ট 2, 2026
    বাংলাদেশ

    ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে মার্কিন দূতের বৈঠক, যা বললেন জামায়াত আমির

    আগস্ট 1, 2026
    বাংলাদেশ

    দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, আগামী ২৯ অক্টোবর যোগ দেবেন ১৪ হাজার ৩৮৪ নতুন শিক্ষক

    আগস্ট 1, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.