একটি পাসপোর্ট দেখতে ছোট একটি ভ্রমণ নথি হলেও আন্তর্জাতিক সীমান্তে এর গুরুত্ব অনেক বড়। বিদেশের কোনো বিমানবন্দর বা স্থলবন্দরে একজন বাংলাদেশি যখন পাসপোর্ট দেখান, তখন অভিবাসন কর্মকর্তা শুধু সেই ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করেন না। একই সঙ্গে তিনি পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতাও যাচাই করেন।
তিনি দেখতে চান, পাসপোর্টটি আসল কি না, এর তথ্য সঠিক কি না, নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিতভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না এবং ওই ব্যক্তি ভিসার শর্ত ভঙ্গ করলে বাংলাদেশ দায়িত্বশীল আচরণ করবে কি না। অর্থাৎ একজন নাগরিকের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার দেশের পরিচয়ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ এবং কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের পাসপোর্টের দুর্বল অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। তবে তা আত্মসম্মানহীন তুলনা, হতাশা বা জাতীয় লজ্জার ভাষায় নয়। বরং সমস্যাটিকে রাষ্ট্রীয় নীতি, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত।
হেনলি পাসপোর্ট সূচকে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার তথ্য ব্যবহার করে ১৯৯টি পাসপোর্টকে এমন গন্তব্যের সংখ্যার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়, যেখানে পাসপোর্টধারীরা আগাম ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তালিকায় সিঙ্গাপুর শীর্ষে রয়েছে। বাংলাদেশ ৯৭তম অবস্থানে রয়েছে এবং একই অবস্থানে আছে উত্তর কোরিয়া।
এ ধরনের তালিকা কোনো দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি, মর্যাদা বা জনগণের যোগ্যতা নির্ধারণ করে না। এটি মূলত বোঝায়, অন্য রাষ্ট্রগুলো ওই দেশের নাগরিকদের কতটা সহজে নিজেদের ভূখণ্ডে প্রবেশের সুযোগ দিতে প্রস্তুত। তাই বাংলাদেশের অবস্থানকে সম্মানের প্রশ্নে না দেখে আন্তর্জাতিক চলাচলের ক্ষেত্রে আস্থার ঘাটতি হিসেবে বিশ্লেষণ করা বেশি যৌক্তিক।
শুধু ভিসামুক্ত চুক্তিই যথেষ্ট নয়
অনেকের ধারণা, কয়েকটি বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে ভিসামুক্ত চুক্তি করলেই বাংলাদেশের পাসপোর্ট দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। কোনো রাষ্ট্র সাধারণত কেবল রাজনৈতিক বন্ধুত্বের কারণে অন্য দেশের নাগরিকদের অবাধ প্রবেশাধিকার দেয় না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা অবৈধ অবস্থান, অনুমতি ছাড়া কর্মসংস্থান, জাল কাগজপত্র, আশ্রয় আবেদন, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং নাগরিক ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া বিবেচনা করে।
বাংলাদেশের তাই একটি সমন্বিত জাতীয় চলাচল কৌশল প্রয়োজন। এই কৌশলের সঙ্গে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশন, জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোকে যুক্ত করতে হবে।
পাসপোর্টের শক্তি বৃদ্ধিকে বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এটি পরিচয়ব্যবস্থা, নিরাপদ অভিবাসন, শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন, শ্রমবাজার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বিত প্রকল্প হতে হবে।
বিশেষায়িত চলাচল কূটনীতি প্রয়োজন
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাসপোর্ট ও আন্তর্জাতিক চলাচলবিষয়ক একটি বিশেষায়িত শাখা গঠন করা যেতে পারে। এই শাখা সম্ভাবনাময় দেশগুলো চিহ্নিত করবে, প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা আলোচনাপত্র প্রস্তুত করবে এবং ভিসা সহজীকরণের পক্ষে তথ্যভিত্তিক যুক্তি উপস্থাপন করবে।
সব দেশের সঙ্গে একই ধরনের আলোচনা ফলপ্রসূ হবে না। কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী, কোনো দেশে বড় শ্রমবাজার রয়েছে, কোথাও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন, আবার কোথাও পর্যটন ও চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিদের যাতায়াত বেশি। এসব বাস্তবতার ভিত্তিতে দেশভেদে আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
যেসব দেশে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের ভিসার শর্ত ভঙ্গ, অবৈধ কর্মসংস্থান বা অতিরিক্ত সময় অবস্থানের হার তুলনামূলকভাবে কম, সেসব দেশের সঙ্গে প্রথমে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। কারণ সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক তথ্য তুলে ধরা সহজ হবে।
তবে শুরুতেই পূর্ণ ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকারের দাবি জানানো সব সময় বাস্তবসম্মত নয়। ধাপে ধাপে সুবিধা আদায় অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। যেমন অনলাইন ভিসা, আগমনী ভিসা, দীর্ঘমেয়াদি একাধিকবার প্রবেশের ভিসা, ব্যবসায়ী ও শিক্ষকদের জন্য দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তি, শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ যাচাই, স্বল্পমেয়াদি যাত্রাবিরতি সুবিধা এবং নির্ভরযোগ্য ভ্রমণকারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
সীমিত সুবিধা পাওয়ার পর বাংলাদেশি ভ্রমণকারীরা নিয়ম মেনে চললে তা ভবিষ্যতে আরও বড় সুবিধার ভিত্তি তৈরি করবে। অর্থাৎ পাসপোর্টের শক্তি একবারে নয়, আস্থা তৈরির ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাড়তে পারে।
নিরাপদ পাসপোর্টের পাশাপাশি নির্ভুল পরিচয়ব্যবস্থা দরকার
বাংলাদেশে বৈদ্যুতিন পাসপোর্ট চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এতে জালিয়াতি প্রতিরোধ, পরিচয় যাচাই এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তির পাসপোর্ট বই থাকলেই সব সমস্যা সমাধান হয় না।
পাসপোর্টে যে পরিচয় লেখা হচ্ছে, তার উৎস তথ্য যদি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে বিদেশি কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করতে পারে। বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্টের তথ্যের মধ্যে এখনো অনেক ক্ষেত্রে নামের বানান, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার পরিচয় এবং বাংলা নামের বিদেশি ভাষায় রূপান্তরে পার্থক্য দেখা যায়।
একই ব্যক্তির জন্মনিবন্ধনে এক ধরনের বানান, জাতীয় পরিচয়পত্রে অন্য ধরনের বানান এবং পাসপোর্টে আরেক ধরনের বানান থাকলে তা আন্তর্জাতিক ভ্রমণে বড় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এসব ভুল সব সময় জালিয়াতির কারণে হয় না; প্রশাসনিক ভুল, অসচেতনতা এবং তথ্য সংরক্ষণের দুর্বলতাও দায়ী। কিন্তু বিদেশি সীমান্ত কর্মকর্তা ভুলটির পেছনের কারণ জানেন না। তার কাছে অসামঞ্জস্য মানেই সম্ভাব্য ঝুঁকি।
এ কারণে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্টের তথ্যভান্ডারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করতে হবে। একজন নাগরিকের মূল পরিচয় একবার নিশ্চিত হওয়ার পর সব সরকারি নথিতে একই তথ্য ব্যবহৃত হওয়া উচিত। তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়াও সহজ, স্বচ্ছ এবং সময়সীমাবদ্ধ করতে হবে।
বৈদ্যুতিন পাসপোর্ট বিদেশে যাচাইযোগ্য হতে হবে
বৈদ্যুতিন পাসপোর্টে থাকা চিপ নিরাপদ হলেও বিদেশি সীমান্তে সেটি যথাযথভাবে যাচাই করা না গেলে প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার সরকারি চাবি তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ বৈদ্যুতিন ভ্রমণ নথির ডিজিটাল সনদ আদান-প্রদান করে।
বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার পাসপোর্টের ডিজিটাল তথ্য বিদেশি কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে যাচাই করতে পারে। একই সঙ্গে হারানো, চুরি হওয়া, বাতিল করা এবং প্রতারণার মাধ্যমে সংগ্রহ করা পাসপোর্টের তথ্য দ্রুত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় জানাতে হবে।
বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। বাংলাদেশের পরিচয় যাচাই, পাসপোর্ট নিরাপত্তা এবং জালিয়াতি প্রতিরোধের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।
একটি দেশের নথি যত দ্রুত যাচাই করা যায়, সেই দেশের নাগরিকদের সীমান্তে সন্দেহের মুখে পড়ার ঝুঁকি তত কমে।
বিদেশে নাগরিকের আচরণও পাসপোর্টের শক্তি নির্ধারণ করে
পাসপোর্টের মর্যাদা শুধু সরকারি দপ্তরের কাজে নির্ভর করে না। বিদেশে নাগরিকদের আচরণও বড় ভূমিকা রাখে। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবস্থান করা, অনুমতি ছাড়া কাজ করা, ভুয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি দেখানো, জাল আর্থিক নথি জমা দেওয়া, ভ্রমণের উদ্দেশ্য গোপন করা এবং ভিত্তিহীন আশ্রয় আবেদন করা হলে সংশ্লিষ্ট দেশ পুরো জাতির নাগরিকদের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
অল্পসংখ্যক মানুষের অনিয়মের কারণে নিয়ম মেনে চলা পর্যটক, শিক্ষার্থী, গবেষক, ব্যবসায়ী, রোগী ও পারিবারিক ভ্রমণকারীদেরও কঠোর যাচাইয়ের মুখে পড়তে হয়। ভিসা আবেদন দীর্ঘ হয়, নথির সংখ্যা বাড়ে, সাক্ষাৎকার কঠিন হয় এবং প্রত্যাখ্যানের হারও বেড়ে যেতে পারে।
এখানে শুধু নাগরিককে দোষ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অনেক অনিয়মের শুরু হয় বাংলাদেশেই। প্রতারক দালাল, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, ভুল ভিসায় কর্মী পাঠানো, জাল ভর্তি নথি এবং অসত্য তথ্য দিয়ে আবেদন করার প্রবণতা মানুষকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়।
সরকারকে তাই বিদেশগামী কর্মী ও শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর প্রস্থানপূর্ব প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ভিসার শর্ত, বিদেশের আইন, কাজের অনুমতি, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে করণীয় এবং আইনগত সহায়তা পাওয়ার উপায় স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
দায়িত্বহীন নিয়োগব্যবস্থা পাসপোর্টকে দুর্বল করে
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় শক্তি হলো বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যা। কিন্তু এই খাতের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় আন্তর্জাতিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অত্যধিক নিয়োগ ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক কর্মী ঋণগ্রস্ত হন। প্রতিশ্রুত চাকরি না পেলে তারা বাধ্য হয়ে অনুমতি ছাড়া অন্য কাজে যুক্ত হন বা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করেন।
এ কারণে নিয়োগ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কর্মীর কাছ থেকে নেওয়া অর্থ, চাকরির চুক্তি, বেতন, কাজের ধরন, আবাসন এবং বিমার তথ্য সরকারি ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
অবৈধ মধ্যস্থতাকারী ও প্রতারক নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের আইনি সহায়তা ও অভিযোগ জানানোর সুযোগ বাড়াতে হবে।
নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি সরকারগুলোর কাছে বাংলাদেশি নাগরিকদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। এটি ভবিষ্যতের ভিসা আলোচনাতেও সহায়ক হবে।
নাগরিক ফেরত নেওয়ার দায়িত্ব এড়ানো যাবে না
কোনো বিদেশি সরকার যদি আইনগতভাবে অবস্থানের অধিকার হারানো ব্যক্তির জাতীয়তা যাচাই করতে চায়, তাহলে বাংলাদেশকে দ্রুত সহযোগিতা করতে হবে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও নাগরিককে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সংশ্লিষ্ট দেশ মনে করতে পারে যে বাংলাদেশ অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল নয়।
একদিকে সহজ প্রবেশাধিকার চাইব, অন্যদিকে আইন ভঙ্গকারী নাগরিকের পরিচয় যাচাই বা প্রত্যাবর্তনে সহযোগিতা করব না—এই দ্বৈত অবস্থান আন্তর্জাতিক আলোচনায় গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় অবশ্যই মানবাধিকার, আইনি সুরক্ষা এবং ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি নির্যাতন, পাচার বা প্রতারণার শিকার হলে তার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। দায়িত্বশীলতা মানে শুধু দ্রুত ফেরত নেওয়া নয়; ন্যায়সংগত ও মানবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও এর অংশ।
তথ্যভিত্তিক কূটনৈতিক দরকষাকষি দরকার
ভিসা সহজীকরণের আলোচনায় আবেগের চেয়ে তথ্য বেশি কার্যকর। বাংলাদেশকে দেখাতে হবে, তার নাগরিকরা সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, পর্যটন, চিকিৎসা, গবেষণা এবং বাণিজ্যে কী অবদান রাখছেন।
কতজন বাংলাদেশি পর্যটক নির্ধারিত সময়ে ফিরে এসেছেন, তারা কত অর্থ ব্যয় করেছেন, শিক্ষার্থীরা কত শিক্ষাব্যয় পরিশোধ করছেন, ব্যবসায়ীরা কত বিনিয়োগ করেছেন, দুই দেশের বাণিজ্য কত বেড়েছে এবং গবেষণা সহযোগিতায় কী ফল এসেছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজার, তৈরি পোশাক, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, বিমানযাত্রার চাহিদা, প্রবাসী জনগোষ্ঠী, শিক্ষা ও চিকিৎসাভ্রমণ আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষির শক্তি হতে পারে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও বাংলাদেশ অন্যতম বড় অবদানকারী দেশ। এই ভূমিকা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দায়িত্বশীলতা ও সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। তবে শুধু ভাবমূর্তি দিয়ে ভিসা সুবিধা পাওয়া যায় না; ইতিবাচক ভাবমূর্তির সঙ্গে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান যুক্ত করতে হবে।
আঞ্চলিক চলাচলে বাস্তব অগ্রগতি সম্ভব
বিশ্বের বড় বড় দেশে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার অর্জন সময়সাপেক্ষ। কিন্তু প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক পর্যায়ে দ্রুত কিছু বাস্তব সুবিধা অর্জন করা সম্ভব।
বিমসটেক, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, গবেষক, রোগী, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সংগঠিত পর্যটক দলের যাতায়াত সহজ করা যেতে পারে।
সমন্বিত অনলাইন আবেদন, কম ভিসা ফি, দ্রুত চিকিৎসা ভিসা, ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ভ্রমণ পরিচয়পত্র, শিক্ষার্থীদের সহজ যাচাই এবং স্থলবন্দরে সরল অনুমতিপদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।
এসব উদ্যোগ হয়তো সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বদলে দেবে না। কিন্তু মানুষের বাস্তব যাতায়াত সহজ করবে। একটি পাসপোর্টের মূল্য শুধু কতটি দেশে ভিসা ছাড়া যাওয়া যায়, তা দিয়ে নির্ধারণ করা উচিত নয়; কত দ্রুত, কম খরচে এবং সম্মানের সঙ্গে ভ্রমণ করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্জিত সুবিধা স্থায়ী নয়
কোনো রাষ্ট্র একবার ভিসামুক্ত সুবিধা পেলেই তা চিরস্থায়ী হয়ে যায় না। রাষ্ট্রীয় নীতি, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বা অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় অবনতি হলে সুবিধা প্রত্যাহার করা হতে পারে।
মার্চ ২০২৬ সালে ইউরোপীয় কমিশন জর্জিয়ার কূটনৈতিক, সেবামূলক ও সরকারি পাসপোর্টধারীদের ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা স্থগিত করে। ভিসামুক্ত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন না করার অভিযোগে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। পাসপোর্টের শক্তি শুধু নতুন চুক্তি অর্জনের ওপর নির্ভর করে না; অর্জিত আস্থা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে, পরিচয় নথিতে অনিয়ম বাড়লে, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হলে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার লঙ্ঘিত হলে চলাচলের সুবিধা দ্রুত সীমিত হয়ে যেতে পারে।
পাঁচ বা দশ বছরের জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে
বাংলাদেশের উচিত পাঁচ বা দশ বছর মেয়াদি একটি জাতীয় চলাচল কৌশল গ্রহণ করা। এতে স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য থাকতে হবে।
কতটি দেশের সঙ্গে অনলাইন ভিসা, আগমনী ভিসা বা ভিসামুক্ত ব্যবস্থা করা হবে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার কতটা কমানো হবে, বিদেশে অতিরিক্ত সময় অবস্থানের হার কীভাবে কমবে, পরিচয় যাচাই কত দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং জাল নথির সংখ্যা কতটা কমানো হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিদেশে আটক বা প্রত্যাবর্তনের মুখে থাকা নাগরিকের জাতীয়তা যাচাই, জরুরি ভ্রমণ নথি প্রদান এবং কনস্যুলার সিদ্ধান্তের সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
প্রতি বছর একটি জাতীয় চলাচল প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। সেখানে দেশভিত্তিক ভিসা সুবিধা, প্রত্যাখ্যানের হার, অনিয়মিত অবস্থান, কনস্যুলার সেবা, পাসপোর্ট জালিয়াতি, পরিচয় সংশোধন এবং দূতাবাসগুলোর কার্যকারিতা তুলে ধরা যেতে পারে।
দূতাবাসগুলোর কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগ নয়, নাগরিকসেবা ও চলাচল সুবিধা বৃদ্ধির অগ্রগতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পাসপোর্টের শক্তি আসলে জাতীয় বিশ্বাসযোগ্যতা
একটি শক্তিশালী পাসপোর্টের পেছনে কয়েকটি মৌলিক আস্থা কাজ করে। বিদেশি সরকারকে বিশ্বাস করতে হয় যে নথিটি আসল, পাসপোর্টধারীর পরিচয় নিশ্চিত, তিনি ভ্রমণের শর্ত মানবেন এবং কোনো সমস্যা হলে তার রাষ্ট্র দায়িত্বশীল আচরণ করবে।
এই আস্থা শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচনার টেবিলে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় জন্মনিবন্ধন কার্যালয়ে সঠিক তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে, জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল কমানোর মাধ্যমে, পাসপোর্ট অফিসে দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করার মাধ্যমে, নিয়োগ সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এবং দূতাবাসে দ্রুত নাগরিকসেবা দেওয়ার মাধ্যমে।
এটি আরও তৈরি হয় আদালতের কার্যকর ভূমিকা, সীমান্ত তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা, শ্রমিকের অধিকার রক্ষা, শিক্ষার্থীর সঠিক নথি যাচাই এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের পাসপোর্ট শক্তিশালী করার আলোচনা তাই কেবল ভ্রমণের সুবিধা বাড়ানোর আলোচনা নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দক্ষতা, আইনের শাসন, নাগরিক পরিচয়ের নির্ভুলতা, নিরাপদ অভিবাসন, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর আলোচনা।
সবুজ পাসপোর্টের প্রকৃত শক্তি তখনই বাড়বে, যখন একজন বাংলাদেশি বিদেশি সীমান্তে পৌঁছে শুধু একটি নিরাপদ নথিই দেখাবেন না, বরং তার পেছনে থাকবে একটি দায়িত্বশীল, সংযুক্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা।

