বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকেই টানাপোড়েনের মধ্যে থাকা ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নতুন জটিলতা সামনে এসেছে। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন।
ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে আসছে তারেক রহমানের সরকার। কিন্তু ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য সেই উদ্যোগকে আবারও কঠিন করে তুলেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে সম্ভাব্য সমাধানের পথ খুঁজতে আলোচনা করছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য এখনো অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি।
কেন থমকে গেল ভারত সফর?
ভারত আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে আগস্টে তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক বৈঠক ও যোগাযোগও হয়েছে।
ভারত ঢাকায় নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে সাবেক মন্ত্রী ও ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়োগকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে নয়াদিল্লির আগ্রহের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।
গত মঙ্গলবার ত্রিবেদী তারেক রহমানের সরকারের প্রতি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অতীতকে ভুলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে অতীতের মতপার্থক্যগুলো সমাধান করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের এক অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চান তারেক রহমানের ভারত সফরটি স্মরণীয় হয়ে থাকুক।
কিন্তু সেই সফরের পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা আসে ৫ আগস্ট। ওই দিন দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। বাংলাদেশে তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পূর্তিতে দেওয়া ওই বক্তব্যে তিনি দেশে ফিরে আসার কথাও বলেন।
ঢাকা এতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। ভারত অবশ্য জানায়, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। কিন্তু তাতেও বাংলাদেশের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি।
দুই দেশের অবস্থান কী?
প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে এখনো প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু বলছে না দিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে তার বলার মতো কিছু নেই।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর অবশ্য শনিবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তার ভাষায়, সম্পর্ক এমন হতে হবে যা দুই দেশের জন্যই কার্যকর এবং উভয় পক্ষের স্বার্থকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি ও সম্মান করে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, ভারত সফর আয়োজনের ক্ষেত্রে ঢাকার কোনো তাড়াহুড়া নেই। নতুন সরকার নিয়ে ভারত ঠিক কী ধরনের সম্পর্ক চায়, সেটিও বাংলাদেশ এখনো পর্যালোচনা করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা ভারতকে যথাযথভাবে বুঝতে হবে। ওই আন্দোলনে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের অবস্থানের প্রতিও ইঙ্গিত করেন তিনি।
চলতি মাসের শুরুতে ভারত জানিয়েছিল, বাংলাদেশের করা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করছে। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও রাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রে সেখানে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনার প্রশ্নই সবচেয়ে বড় বাধা
বাংলাদেশের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ইস্যু। হাসিনার সরকার দীর্ঘদিন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তার শাসনামলে নয়াদিল্লির সমর্থনকে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই দেখেনি।
২০২৫ সালের নভেম্বর অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
ঢাকার অভিযোগ, ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করছে।
১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বার্তায় জানায়, শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক আসামিকে দ্রুত প্রত্যর্পণের অনুরোধ বাস্তবায়নে তারা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে ঢাকা জানিয়েছে, তারা প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি অনুসরণ করবে। এই সম্পর্কের ভিত্তি হবে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সুবিধা।
ভারতের উদ্বেগও কম নয়
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের আরেকটি কারণ হলো ঢাকার সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা। দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নয়নকে নয়াদিল্লি একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাকে নিজের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাকিল আহমেদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অনেক সময় পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলে।
তার ভাষায়, বাংলাদেশের মানুষ ভারতের সঙ্গে এমন সম্পর্ক চায়, যেখানে আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, আগে ভারত বাংলাদেশকে অনেকটা নিজের পররাষ্ট্রনীতির অনুসারী হিসেবে দেখত। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ছাড় দিয়েছিলেন, নতুন সরকারের ক্ষেত্রে তেমনটি হচ্ছে না।
সীমান্ত নিয়েও দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি রয়েছে। ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেওয়ার উদ্যোগ এবং দেশটির ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য ঢাকার অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে।
এ ছাড়া ভারত যাদের অনিবন্ধিত বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে দাবি করছে, তাদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনাও বিতর্ক তৈরি করেছে। ঢাকার অভিযোগ, কূটনৈতিক যাচাই ছাড়াই ভারত কিছু মানুষকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে?
ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদ্বাজ মনে করেন, তারেক রহমানের ভারত সফর পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে।
তবে তার মতে, শেখ হাসিনার বিষয়টি রাজনৈতিক নিপীড়নের সঙ্গে যুক্ত। হাসিনার সরকারই দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে থাকা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা করেছিল।
ভরদ্বাজ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অংশীদারত্ব বাড়াতে ভারতের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু তারেক রহমান উন্নয়নের চেয়ে রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে তিনি মনে করেন।
তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে যতই মতপার্থক্য থাকুক, দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হলে এ বিষয়টি একসময় রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে মোকাবিলা করতেই হবে।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীেরাধা দত্তের মতে, দুই দেশের মধ্যে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের পক্ষে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে থাকা সম্ভব নয়।
তার মতে, শুধু সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষত নিজে থেকেই সেরে যাবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের প্রাথমিক উষ্ণতা জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের চাপে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
দত্তের মতে, বাংলাদেশের নতুন সরকার শেখ হাসিনার সরকারের মতো ভারতের প্রতি একই ধরনের ঘনিষ্ঠতা দেখাবে না—এই বাস্তবতা নয়াদিল্লিকে মেনে নিতে হবে। তবে সেটি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পথে বাধা হওয়ার কথা নয়।
কারণ শেষ পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশ প্রতিবেশী। তাই আবেগ, রাজনৈতিক পছন্দ কিংবা পুরোনো ঘনিষ্ঠতার পরিবর্তে পারস্পরিক স্বার্থ ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই দুই দেশের সামনে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।

