বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সরাসরি আকাশপথে যাতায়াতের সুযোগ আবারও বাস্তবতার কাছাকাছি চলে এসেছে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত মান অর্জন করতে পারলে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকেই ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
তবে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নির্ধারিত নিরীক্ষায় বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় গ্রেড অর্জন করতে হবে। নিরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত হলে নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার পথ খুলে যাবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
রোববার সচিবালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও নিয়মিত যাত্রীদের জন্য এটি সময় ও যাতায়াতের জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি করবে।
নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়টি শুধু নতুন একটি আন্তর্জাতিক গন্তব্য যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থার নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানের সক্ষমতার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নির্ধারিত নিরীক্ষায় প্রয়োজনীয় গ্রেড অর্জন করাই এ ক্ষেত্রে মূল বিষয়। অর্থাৎ সরাসরি ফ্লাইট চালুর ইচ্ছা থাকলেও নির্ধারিত নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত মান পূরণ না হলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
তাই আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে জানুয়ারি থেকেই নতুন রুট চালুর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নিউইয়র্কের মতো দীর্ঘপথের আন্তর্জাতিক গন্তব্য চালু করার পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সামনে রয়েছে নিজস্ব বহর সম্প্রসারণের বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে উড়োজাহাজের সংকট রয়েছে। এই সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে বিদ্যমান ফ্লাইটের সংখ্যাও চাহিদা অনুযায়ী বাড়ানো যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পর্যায়ক্রমে অন্তত ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এ বিষয়ে চুক্তি সই করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর পরের বছর থেকে নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু নিউইয়র্ক নয়, বর্তমানে যেসব আন্তর্জাতিক রুটে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনা করা যাচ্ছে না, সেসব রুটেও ফ্লাইট বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী ও যাত্রী নিয়মিত এসব রুট ব্যবহার করেন।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় পাঁচটি গন্তব্যে বর্তমানে প্রতিদিন কয়েকটি করে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ পাওয়া গেলে এসব গন্তব্যে ফ্লাইটের সংখ্যা দ্বিগুণ বা তিন গুণ করার সুযোগ রয়েছে।
এখানে উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো শুধু যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় নয়। এর সঙ্গে টিকিটের প্রাপ্যতা, ভাড়া, যাত্রীসেবা এবং প্রবাসীদের দেশে আসা-যাওয়ার সুবিধাও সরাসরি সম্পর্কিত।
ফলে বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ সফল হলে একদিকে নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্য চালুর পথ সহজ হবে, অন্যদিকে বিদ্যমান ব্যস্ত রুটগুলোতেও চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সংকট কাটাতে লিজে উড়োজাহাজ আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে মূলত একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় নতুন উড়োজাহাজ ২০৩১ সাল থেকে দেশে আসবে। অর্থাৎ নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।
এই সময়ের মধ্যে যাত্রীসেবা সচল রাখা এবং নতুন রুট সম্প্রসারণের জন্য লিজে উড়োজাহাজ আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। মন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।শুধু উড়োজাহাজ বাড়ানো নয়, বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নও সরকারের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। চলতি মাসের ২৫ তারিখে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্র জমা দেবে।
এরপর দরপত্র মূল্যায়ন শেষ করে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে চুক্তি সই করার আশা করছে সরকার।
চুক্তি সইয়ের পর কাজ শেষ করার জন্য হাতে থাকবে প্রায় সাড়ে তিন মাস। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্ভব হলে আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনালের সফট ওপেনিং করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে শুধু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করাই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য নয়। কাজের মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে আরও এক-দুই মাস সময় বাড়ানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরকে লক্ষ্য ধরে এগোলেও মানের সঙ্গে আপস করতে চায় না কর্তৃপক্ষ।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সেবা নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ নতুন নয়। টিকিট, সেবা, সময়সূচি কিংবা বিমানবন্দরে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, যাত্রী হয়রানি বন্ধে ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এতে কিছুটা সাফল্যও এসেছে। তবে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান এখনো হয়নি।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেছেন, দলগতভাবে কাজ করে বিমানকে যাত্রীদের প্রত্যাশিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।
নিউইয়র্কের মতো দীর্ঘপথের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করা গেলেও যদি যাত্রীসেবার মান প্রত্যাশা অনুযায়ী না হয়, তাহলে নতুন রুটের সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে। তাই উড়োজাহাজ ও রুট সম্প্রসারণের পাশাপাশি সেবার মান উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মন্ত্রী।
তার মতে, পর্যটন, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স—এই তিন ক্ষেত্রকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। দেশের বিমান পরিবহন খাতকে এগিয়ে নিতে সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
যারা দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন, তাদের পুরস্কৃত করা হবে। আর যারা দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন না, তাদের সম্মানের সঙ্গে সরিয়ে নতুন লোক আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ অবস্থান থেকে বোঝা যায়, নতুন নেতৃত্ব শুধু অবকাঠামো ও উড়োজাহাজ বাড়ানোর দিকে নয়, ব্যবস্থাপনার দক্ষতার দিকেও নজর দিতে চাইছে।যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর অংশ হিসেবে বিমানবন্দর ও উড়োজাহাজের পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন মন্ত্রী।
তিনি জানিয়েছেন, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিমান পর্যন্ত সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাত্রীদের জন্য উন্নত পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি রুচিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন তিনি।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি দেশের প্রবেশদ্বারের মতো কাজ করে। বিদেশি যাত্রীদের কাছে দেশের প্রথম ধারণা অনেকাংশেই বিমানবন্দরকেন্দ্রিক। তাই পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান উন্নয়ন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত।
বিমান পরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণে ঢাকার বাইরে আরও কিছু বিমানবন্দরকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
ঈশ্বরদী বিমানবন্দরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, সেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে এবং ইউরেনিয়াম পরিবহনের প্রয়োজন হয়।
সড়কপথে ইউরেনিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে বিকিরণজনিত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে সরকার। এ কারণেই ঈশ্বরদী বিমানবন্দরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটিকে সম্প্রসারণ করে কয়েকটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালুর চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
এতে সেখানে কর্মরত বিদেশিদের যাতায়াত সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রেও বিমানবন্দরটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে সামনে একাধিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালু, অন্তত ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট বাড়ানো, তৃতীয় টার্মিনালের কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং ঈশ্বরদী বিমানবন্দর সম্প্রসারণ—সবগুলো উদ্যোগই বিমান খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে এসব পরিকল্পনার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। নিউইয়র্কের সরাসরি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষায় প্রয়োজনীয় গ্রেড অর্জন করতে হবে। নতুন রুট চালুর জন্য পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ নিশ্চিত করতে হবে। আর যাত্রীদের ধরে রাখতে হলে সেবার মানও উন্নত করতে হবে।
বিশেষ করে ২০৩১ সাল থেকে বোয়িংয়ের নতুন উড়োজাহাজ দেশে আসার আগ পর্যন্ত সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় লিজে উড়োজাহাজ এনে বহরের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের গতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
যদি নিরাপত্তা, বহর, অবকাঠামো এবং যাত্রীসেবা—এই চারটি জায়গায় একসঙ্গে উন্নতি করা যায়, তাহলে নিউইয়র্কের সরাসরি ফ্লাইট শুধু একটি নতুন রুট হবে না। এটি বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার একটি বড় সুযোগও হয়ে উঠতে পারে।

