জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। এই সময়ের ব্যবধানে আন্দোলনের নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও বিচারিক দিক নিয়ে আলোচনা হলেও, সরকারি হাসপাতালের মৃত্যুর নিবন্ধন বিশ্লেষণ এক ভয়াবহ বাস্তবতার সামনে দেশকে দাঁড় করিয়েছে। সেই তথ্য বলছে, আহতদের বড় একটি অংশ চিকিৎসকের হাতে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সময়মতো চিকিৎসা ও নিরাপদ হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানির সংখ্যা কতটা কমানো সম্ভব হতো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তুত করা সরকারি হাসপাতালের ৮৩১ জন জুলাই শহীদের মৃত্যুর নিবন্ধন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুরুতর আহত অবস্থায় ৬৫৫ জন, অর্থাৎ ৭৮.৮ শতাংশ মানুষ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান। অন্যদিকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ১৭৬ জন বা প্রায় ২১ শতাংশ। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মোট ৮৪৩ জন শহীদ এবং ১৪ হাজার ৩৭০ জন আহত হন।
এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং সেই সময়ের চিকিৎসা সংকট, জরুরি সেবার সীমাবদ্ধতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। প্রতি পাঁচজন শহীদের মধ্যে প্রায় চারজন চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারিয়েছেন, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে।
নিবন্ধনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিহতদের বড় অংশের গুলির আঘাত ছিল মাথা, গলা, বুক কিংবা পেটের মতো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। আবার অনেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, গুরুতর অঙ্গহানি কিংবা আগুনে দগ্ধ হওয়ার কারণে মারা যান। চিকিৎসকদের মতে, গুলিবিদ্ধ রোগীর জন্য প্রথম এক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের মধ্যে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ, শ্বাসপ্রশ্বাস সচল রাখা এবং দ্রুত অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা গেলে বহু জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়। কিন্তু জুলাইয়ের সেই অস্থির দিনগুলোতে অনেক আহত ব্যক্তি দীর্ঘ সময় রাস্তায় পড়ে ছিলেন, অনেকেই নিরাপদ পরিবহন পাননি, আবার কেউ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
সরকারি তথ্যে আরও দেখা যায়, মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা ৬৫৫ জনের মধ্যে ৩৩৮ জনের মৃত্যুর তারিখ নথিভুক্ত থাকলেও বাকি ৩১৭ জনের ক্ষেত্রে মৃত্যুর সময় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তাঁদের প্রকৃত মৃত্যুর সময় সম্পর্কে সরকারি নথিতে স্পষ্ট তথ্য নেই।
হাসপাতালগুলোতে সংরক্ষিত তথ্য থেকে বোঝা যায়, আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে প্রাণহানি ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। শুধু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক দিনেই ১৪৩ জন শহীদের মরদেহ বিভিন্ন হাসপাতালে আনা হয়। এর আগে ১৯ জুলাই ৯১ জন, ৪ আগস্ট ৪২ জন, ২০ জুলাই ৩৩ জন এবং ১৮ জুলাই ২৯ জনের মরদেহ হাসপাতালে পৌঁছায়। এমনকি ৫ আগস্টের পরও অন্তত ৩৫ জন শহীদের মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়, যার মধ্যে ৬ আগস্টই ছিল ২১ জন। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক মরদেহ রাস্তা বা বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
সেই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বিভিন্ন চিকিৎসক জানান, দেশের বড় হাসপাতালগুলো কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। একের পর এক গুরুতর আহত মানুষ হাসপাতালে আসছিলেন। অস্ত্রোপচার কক্ষগুলোতে বিরামহীনভাবে চিকিৎসা চলছিল। কোথাও মরদেহ রাখার জায়গা না থাকায় একটি স্থানে একাধিক মরদেহ সংরক্ষণ করতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল, যখন হাসপাতালের করিডর, বারান্দা এমনকি মর্গের বাইরের স্থানেও মরদেহ রাখতে হয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মাথা, গলা ও বুকে গুলিবিদ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া। কারফিউ ও চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তারপরও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেক চিকিৎসক পায়ে হেঁটে বা রিকশায় হাসপাতালে পৌঁছে জরুরি অস্ত্রোপচারে অংশ নিয়েছিলেন।
আন্দোলনের সময় আহতদের পরিচয় নিয়েও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসকদের দাবি, অনেক আহত ব্যক্তি গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করেছিলেন। কোথাও কোথাও আহতদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে হাসপাতালের নথিতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে অন্য কারণও উল্লেখ করা হয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, সেই সময় তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল মানুষের জীবন বাঁচানো।
বিভিন্ন পরিবারের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের করুণ বাস্তবতার কথা তুলে ধরে। কেউ মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন, কেউ গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা শুরুর আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আবার কেউ হাসপাতালে নেওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছেন। অনেক পরিবার দিনের পর দিন প্রিয়জনকে খুঁজে শেষে হাসপাতালের মর্গে মরদেহ শনাক্ত করেছেন। কেউ কেউ আবার দীর্ঘ সময় পর গণকবর থেকে স্বজনের কবরের সন্ধান পেয়েছেন, কিন্তু শেষবারের মতো মুখ দেখার সুযোগও পাননি।
দুই বছর পর এই পরিসংখ্যান শুধু অতীতের একটি নির্মম স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো জাতীয় সংকট বা সহিংস পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, দ্রুত রোগী পরিবহন, পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ এবং বিশেষায়িত আঘাত চিকিৎসাকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কারণ এমন পরিস্থিতিতে কয়েক মিনিটের বিলম্বও একটি জীবন বাঁচানো ও হারানোর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এই সরকারি তথ্য তাই শুধু নিহতের সংখ্যা তুলে ধরে না; এটি দেখিয়ে দেয়, সংকটময় সময়ে কার্যকর জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও প্রস্তুত ও সক্ষম করার প্রয়োজনীয়তার কথাও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

