যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি জমানো মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছেন প্রায় সাড়ে নয় লাখ মানুষ, যা বিগত পাঁচ বছরের হিসাবে সর্বনিম্ন সংখ্যা।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত সরকারি সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত অর্থবছরে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই বছর ধরেই এই নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে এবং চলতি অর্থবছরেও এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা, কেননা সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলায় প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার অভিবাসন বিষয়ক কর্মসূচির একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার কমতে শুরু করে। তার মতে, এর প্রধান কারণ হলো যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং এর জেরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে বিমান যোগাযোগে সৃষ্ট বিঘ্ন। তিনি জানান, সাধারণত প্রতি মাসে গড়ে প্রায় এক লাখ মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যেতেন, তবে বর্তমানে সেই প্রবাহে ভাটা পড়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিগত এক দশকে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট আশি লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশই গিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ঠিক তার আগের অর্থবছরেই অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে প্রায় বারো লাখ মানুষ বিদেশে গিয়েছিলেন, যা দেশের ইতিহাসে একক অর্থবছরে সর্বোচ্চ সংখ্যা।
ওই কর্মকর্তা আরও ব্যাখ্যা করেন, গত চার দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশি শ্রমশক্তির জন্য সবচেয়ে বড় বাজার এবং রেমিট্যান্স আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ৬০ থেকে ৭০ লাখের মতো বাংলাদেশি কর্মরত আছেন, যাদের একটি বড় অংশেরই কোনো স্থায়ী চাকরি নেই।
তিনি জানান, ইরান-কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতি কাতার ও দুবাইয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ইতোমধ্যে বহু শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে শুরু করেছেন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাবে বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজার গড়ে তোলা না গেলে রেমিট্যান্স আয়েও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।
তবে রেমিট্যান্সের সামগ্রিক চিত্রে এখনো কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ, প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে রেমিট্যান্স আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো এই প্রবাহ তিনশ কোটি ডলারের নিচেই থেকে গেছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
জনশক্তি রপ্তানি খাতের একটি সংগঠনের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে কার্যত সৌদি আরবই একমাত্র বড় বাজার হিসেবে টিকে আছে, যেখান থেকে নিয়মিত বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া হচ্ছে। অন্য প্রায় সব প্রচলিত গন্তব্যই এখন কার্যত বন্ধের পথে। তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার নতুন করে খোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কিছুটা বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার জানান, সরকারের সাম্প্রতিক এক উচ্চপর্যায়ের সফরের ফলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তার হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে দুই থেকে তিন লাখ কর্মীর চাহিদা রয়েছে এবং আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকেই নতুন করে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
জনশক্তি রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্ট আরেকজন সাবেক কর্মকর্তা জানান, পূর্ব ইউরোপেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। তবে ভিসা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তার ভাষ্যমতে, ভিসা পেতে বর্তমানে প্রায় পাঁচ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে, যা কমিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করা গেলে আরও অনেক মানুষ বিদেশে কাজের সুযোগ পাবেন।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য চিরাচরিতভাবেই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে থাকবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পূর্ব ইউরোপ, দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং নিউজিল্যান্ডের মতো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান জরুরি হয়ে পড়েছে। তার মতে, বিশ্বব্যাপী কাজের সুযোগের কোনো অভাব নেই, প্রয়োজন কেবল দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। এজন্য দেশের প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য উন্নত মানের ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই বিকল্প বাজার সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের মতো পদক্ষেপগুলো একসঙ্গে নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এই খাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

