চিলমারীর চরে কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “বাড়ি কোথায়?”—এই সাধারণ প্রশ্নটি সেখানে নিছক সৌজন্যবোধের বিনিময় নয়। বরং এটি একজন চরবাসীর অস্তিত্বের গভীরতম জায়গায় গিয়ে আঘাত করে। উত্তরে কেউ হয়তো মাঝনদীর দিকে আঙুল তুলে বলবেন, তার পুরোনো ভিটেমাটি, গ্রাম—সবকিছুই এখন নদীর অতলে হারিয়ে গেছে। চরের জীবন আসলে এই পলি আর জলের চিরন্তন ভাঙা-গড়ার খেলারই এক প্রতিচ্ছবি।
এরপর যখন জানতে চাওয়া হয়, তাহলে এখন থাকেন কোথায়—তখন উত্তর আসে অন্যরকম এক দর্শনের মধ্য দিয়ে: নদীর সঙ্গে তাঁর একরকম অলিখিত বোঝাপড়া হয়ে গেছে, নদী যেদিকে যায়, তিনিও সেদিকেই সরে যান। এই বোঝাপড়া কোনো রূপক নয়—এটি চরবাসীর কাছে অনিশ্চয়তার সঙ্গে বেঁচে থাকার একটি বাস্তব কৌশল, একটি সামাজিক ব্যবস্থা।
চর ভেঙে গেলেই একজন চরবাসীর জীবনে নেমে আসে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা। প্রথম প্রশ্নই হয়ে দাঁড়ায়—এখন কোথায় ঠাঁই মিলবে? এখানেই নদীর সঙ্গে সেই রূপক সমঝোতার বাস্তব রূপ ফুটে ওঠে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন, কেউ অন্যের জমিতে ভাগচাষী হিসেবে থাকেন, কেউ নতুন জেগে ওঠা চরে বসতি গড়েন। সবক্ষেত্রেই লক্ষ্য একটাই—যেখানে আশ্রয় মেলে, সেদিকেই যাত্রা করা। এই বাস্তবতায় কোনো বাড়িই স্থায়ী ঠিকানা নয়, আর পুনর্বাসনের পথও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকেই নিজে খুঁজে বের করতে হয়। এই বৃহত্তর পরিস্থিতির মধ্যেই স্থান করে নিয়েছে একটি নির্দিষ্ট বাস্তব ব্যবস্থা—যাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় “চর চুক্তি”।
নদীভাঙনে গৃহহারা হওয়া মানুষ যখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নেন, তখন জমির মালিকের সঙ্গে যে লিখিত বা মৌখিক সমঝোতা হয়, সেটিই এই চর চুক্তি। এর মাধ্যমে একটি পরিবার সেখানে ঘর তুলতে পারে, কখনো চাষবাসও করতে পারে। বিনিময়ে জমির মালিককে সাধারণত সামান্য একটি অগ্রিম অর্থ দিতে হয়, যা বাজারদরের তুলনায় নামমাত্র হলেও চুক্তিপত্রে তার উল্লেখ থাকে। তবে এই অধিকার কখনোই স্থায়ী নয়—চর বিলীন হলে চুক্তিও শেষ হয়ে যায়। চিলমারীর চরে প্রায় প্রতিটি পরিবারই জীবনের কোনো না কোনো সময় এই চুক্তির অধীনে থাকে, কেউ কেউ আবার সারাজীবনই থাকেন।
কাগজে লেখা হলে এই চুক্তি অনেকটা আদালতের দলিলের মতোই দেখায়—সরকার অনুমোদিত স্ট্যাম্প পেপারে লেখা, আনুষ্ঠানিক ভাষা, সাক্ষীর নাম, স্বাক্ষর বা টিপসই এবং কখনো কখনো সিলমোহরও থাকে। যিনি লিখতে জানেন না, তিনি বুড়ো আঙুলের ছাপ দিয়ে সম্মতি জানান। কাগজের এই আনুষ্ঠানিক রূপ চুক্তিটিকে একধরনের বৈধতার আবহ দেয় বটে, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র বা আদালত এই চুক্তিকে কোনো আইনি স্বীকৃতি দেয় না। তবু নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের কাছে এই কাগজটুকুই অন্যের জমিতে থাকার একমাত্র দৃশ্যমান নিশ্চয়তা।
জমির মালিক কথা না রাখলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আদালতে গিয়ে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না। বিরোধ দেখা দিলে তা মীমাংসা হয় স্থানীয়ভাবে, আর সেখানে শেষ কথা বলেন সাধারণত জমির মালিকই। ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত একটি পুরনো আইন—যা নদীভাঙনে ডুবে যাওয়া জমির মালিকানা সাময়িকভাবে রাষ্ট্রের হাতে দেয় এবং চর জেগে উঠলে তা আবার আগের মালিকের কাছেই ফিরিয়ে দেয়—আজও বাংলাদেশে বলবৎ আছে। ফলে চরের জমি-সম্পর্ক এখনো প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো এক ঔপনিবেশিক কাঠামোতেই আটকে আছে, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পক্ষে কোনো সুরক্ষা নেই।
চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করে নদী নিজেই—কোনো ক্যালেন্ডার নয়। চর যতদিন টিকে থাকে, চুক্তিও ততদিন টিকে থাকে। চর ভেঙে গেলে জমির মালিকও তাঁর অধিকার হারান, আর সেখানে বসবাসকারী পরিবারও হারায় থাকার সুযোগ। তবে এখানেই লুকিয়ে আছে গভীর অসমতা—একই জমি যদি বছর কয়েক পর আবার জেগে ওঠে, তাহলে আইনত পুরোনো মালিকই তাঁর মালিকানা ফিরে পান, কিন্তু যে পরিবার বছরের পর বছর সেই জমিতে বসবাস করেছে, চাষ করেছে, পাহারা দিয়েছে—তাদের কোনো নতুন অধিকার দাবি করার সুযোগ থাকে না।
চরের অনেক জমির মালিকই আসলে চরে বসবাস করেন না—তাঁরা থাকেন শহরে বা মফস্বলে, স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে জমির দেখভাল করেন। তাঁদের কাছে জমিতে মানুষ বসবাস করা আসলে নিজের দখল ধরে রাখার সবচেয়ে সহজ ও সস্তা উপায়। তাই তাঁরা নদীভাঙনে গৃহহারা পরিবারকে নিজের জমিতে বসতি করতে দেন। বিনিময়ে সেই পরিবার জমি রক্ষণাবেক্ষণ করে, চাষাবাদ করে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে মালিকের অনুপস্থিত উপস্থিতি বজায় রাখে। অনেক ক্ষেত্রেই ফসলের একটি অংশ—সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ—জমির মালিককে দিতে হয়, যা ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের একটি ধারাবাহিকতা বলা যায়। এই ভাগচাষভিত্তিক বসবাসকে স্থানীয় ভাষায় “আদি করা” বলা হয়, যা চর চুক্তির সঙ্গে জড়িত হলেও এক ভিন্ন বিষয়।
বাংলাদেশকে প্রায়ই “উন্নয়নের কূটাভাস” হিসেবে বর্ণনা করা হয়—তীব্র দারিদ্র্য ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও যে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে আলোচিত এক দৃষ্টান্ত। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর দেশে যে নতুন সামাজিক চুক্তি গড়ে উঠেছিল, তাতে রাষ্ট্র ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো মানুষের ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু চিলমারীর চরে সেই প্রতিশ্রুতি এখনো ততটা দৃশ্যমান নয়। যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, তারাই যেন এই অন্তর্ভুক্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে। চরাঞ্চলে “চুক্তি” শব্দটির অর্থ তাই প্রায়ই নিজের ভাগ্যের দায় নিজেই বহন করা।
এই বাস্তবতা থেকেই কুড়িগ্রামে সম্প্রতি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার আদায়ে একটি সংগঠিত দাবি উঠে এসেছে। একটি চর-উন্নয়নবিষয়ক সংগঠনের উদ্যোগে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণের আইন প্রণয়ন এবং পৃথক একটি চর মন্ত্রণালয় গঠনের দাবিতে প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের কাছে স্মারকলিপি পেশ করা হচ্ছে। এই দাবির মূল কথা হলো—এতদিন নদীর সঙ্গে চুক্তির যাবতীয় বোঝা একতরফাভাবে চরবাসীকেই বহন করতে হয়েছে; এখন প্রশ্ন উঠছে, এই ক্ষতির দায় কেন শুধু তাদেরই নিতে হবে?
রাষ্ট্রকে ঠিক করতে হবে, নদীভাঙন কীভাবে শনাক্ত ও নথিভুক্ত করা হবে—কোথায় ভাঙন হয়েছে, কত পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কী পরিমাণ জমি ও সম্পদ হারিয়েছে তারা। এই তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা বর্তমানে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। যদি না থাকে, তাহলে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা রাখবে এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করবে।
তবে এই কাঠামো কেমন হবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পর মানুষ নিজের জীবন কীভাবে সাজাবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটুকু তাদের হাতে থাকা। ক্ষতিপূরণের অর্থ নতুন চুক্তি করতে, জমি কিনতে, না অন্য কোনোভাবে জীবন পুনর্গঠনে ব্যবহৃত হবে—তা নির্ধারণের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদেরই দেওয়া উচিত।
এত বছর ধরে নদীভাঙনের কষ্ট, হারানো ভিটেমাটি আর মানুষের দুর্দশার কথা শোনা গেলেও, ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে সামান্য ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্নে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন—এই প্রশ্ন থেকেই যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে নদীভাঙনের মাত্রা ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চরবাসীকে আরও গভীর অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেওয়া আর মেনে নেওয়া যায় না।
চরবাসী নদীর সঙ্গে তাদের নিজস্ব বোঝাপড়া অনেক আগেই করে ফেলেছে। এখন দেখার বিষয়—রাষ্ট্র এই বোঝাপড়ায় নিছক সাক্ষী হয়েই থাকবে, নাকি নিজেও এতে সম্পৃক্ত হবে।

