ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি বেড়েছে নতুন ধরনের ঝুঁকিও। একটি অসতর্ক ক্লিক, অজান্তে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা কিংবা অপরিচিত কারও কাছে একবারের পাসওয়ার্ড (ওটিপি) জানিয়ে দেওয়া একজন মানুষকে বড় ধরনের আর্থিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে তরুণদের, বিশেষ করে নারীদের, আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
‘ক্লিক করার আগে দুবার ভাবুন; সাইবার জ্ঞানই আপনার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা’—এই প্রতিপাদ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল মিলনায়তনে সোমবার সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক একটি কর্মসূচির আয়োজন করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রোকেয়া হল ও বিকাশ লিমিটেডের সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে হলের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি মো. সাইফুদ্দিন শাহীন। অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সাইবার তদন্ত ও অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিকাশ লিমিটেডের বহির্বিষয়ক বিভাগের প্রধান ও নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম মনিরুল করিম।
অনুষ্ঠানে সাইবার হয়রানি, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় চুরি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া লিংক এবং অনলাইন প্রতারণার মতো সাধারণ সাইবার অপরাধের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. সাইফুদ্দিন শাহীন বলেন, বর্তমান প্রজন্ম একই সঙ্গে বাস্তব ও ডিজিটাল—দুই ধরনের জগতে বসবাস করছে। প্রযুক্তি মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তবে এর পাশাপাশি নতুন ধরনের অপরাধ ও ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে এর নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা বৃদ্ধি।
তিনি জানান, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি একবারের পাসওয়ার্ড, পিন নম্বর বা ব্যক্তিগত তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করা, অপরিচিত লিংকে প্রবেশ না করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, অনলাইন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো সাইবার অপরাধের শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া উচিত।
মূল বক্তব্যে অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা, যোগাযোগ, বিনোদন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্র এখন ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। তাই সাইবার নিরাপত্তা বর্তমানে শুধু প্রযুক্তিবিদদের বিষয় নয়, বরং প্রতিটি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় একটি জীবন দক্ষতা।
তিনি বলেন, সাইবার অপরাধীরা অনেক সময় মানুষের অসতর্কতাকে কাজে লাগায়। ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করা কিংবা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করার মাধ্যমে মানুষ নিজের অজান্তেই বড় ধরনের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। কোনো তথ্য যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, একজন দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক কখনো যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার করেন না। সাইবার সচেতন শিক্ষার্থীরা নিজেদের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু ও সমাজকেও ডিজিটাল ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ অতিথি এ কে এম মনিরুল করিম ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার নতুন পদ্ধতিও তৈরি হচ্ছে।
তার মতে, সঠিক তথ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, শিক্ষার্থীরা যাতে নিরাপদভাবে সাইবার জগৎ ব্যবহার করতে পারে, সে বিষয়ে হল প্রশাসন সবসময় পাশে থাকবে। কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হলে শিক্ষার্থীদের ভয় না পেয়ে অভিযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যেও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অনলাইন হয়রানি, ডিজিটাল প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, সাইবার ঝুঁকিও তত পরিবর্তিত হবে। তাই আধুনিক ডিজিটাল জীবনে নিরাপদ থাকতে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণ। একটি ছোট সতর্কতাই অনেক বড় ক্ষতি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

