দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা যেন ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে মোট ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি এ তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি দুটোই উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন নিহত হন। ২০২১ সালে ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২ হাজার ২১৪ জন। ২০২২ সালে ২৯৭টি দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৯১ জন।
এরপর ২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৮৭ জন নিহত হন। ২০২৪ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬১টিতে এবং নিহত হন ২ হাজার ৬০৯ জন। ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২ হাজার ৬৭১ জন। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১৭৭ জন।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ৩ হাজার ৫৪৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৪৯৭টি। ভারী যানবাহনের ধাক্কায় ঘটেছে ৬ হাজার ৩১৪টি দুর্ঘটনা। এ ছাড়া অন্যান্য কারণে ঘটেছে আরও ৭০৬টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার জন্য কোন ধরনের যানবাহন বা চালকের ভূমিকা বেশি ছিল, সেই হিসাবেও একটি উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ছিলেন। বাসের চালকদের দায় পাওয়া গেছে ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ দুর্ঘটনায়। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি ও লরিসহ পণ্যবাহী যানবাহন দায়ী ছিল ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য।
এ ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের কারণে ২ দশমিক ৭২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিন চাকার যানবাহন দায়ী ছিল ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ দুর্ঘটনায়। বাইসাইকেল ও রিকশার কারণে ঘটেছে দশমিক ৭৬ শতাংশ দুর্ঘটনা। আর ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য পথচারীকে দায়ী করা হয়েছে।
সড়কের ধরন অনুযায়ীও দুর্ঘটনার সংখ্যা কম নয়। জাতীয় মহাসড়কে ৪ হাজার ৭৭৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। আঞ্চলিক সড়কে ঘটেছে ৬ হাজার ৬৮৯টি। গ্রামীণ সড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা ১ হাজার ৯৫৭টি এবং শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এসব মোটরসাইকেলের একটি বড় অংশ কিশোর ও তরুণরা ব্যবহার করেন। তাদের মধ্যে দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়ছে। মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনাও অনেক সময় তরুণদের অতিরিক্ত গতির প্রতি আকৃষ্ট করছে বলে মনে করে সংস্থাটি।
এর ফলে শুধু মোটরসাইকেল চালকরাই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন না, পথচারীসহ অন্য সড়ক ব্যবহারকারীরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। একই সঙ্গে বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের একটি অংশ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু দেশে সহজলভ্য ও উন্নত গণপরিবহনের ঘাটতি, পাশাপাশি দীর্ঘ যানজটের কারণে অনেক মানুষ দ্রুত যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভর করছেন। এর ফলে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, মানসম্পন্ন হেলমেট দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮ শতাংশ কমাতে পারে। অথচ অনেক চালক ও আরোহী এখনো যথাযথ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন না।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। কিশোর ও তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাজনীতিতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সংস্কৃতি, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ঘাটতি, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও নজরদারির সীমাবদ্ধতা, সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের অভাব এবং অসহনীয় যানজট—সব মিলিয়েই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
দুর্ঘটনা কমাতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছে তারা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপদ সড়ক বিষয়ে প্রচারণা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ, সাশ্রয়ী ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে মোটরসাইকেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
সাড়ে ছয় বছরের এই পরিসংখ্যান বলছে, মোটরসাইকেল এখন শুধু ব্যক্তিগত যাতায়াতের বাহন নয়, সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি নিরাপদ চালনা, আইন মানা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে প্রাণহানির এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

