একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে, তার পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করতে কিংবা ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে অনেকেই এতিমখানা বা আবাসিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ সহায়তা করেন। উদ্দেশ্য থাকে নিঃসন্দেহে ভালো। অসহায় শিশুর পাশে দাঁড়ানো, তাকে খাবার, শিক্ষা ও আশ্রয় দেওয়ার চেয়ে মানবিক কাজ আর কী হতে পারে—এমনটাই স্বাভাবিক ধারণা।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। একটি শিশুর জন্য প্রতিষ্ঠান কি সত্যিই পরিবারের বিকল্প হতে পারে? নাকি শিশুকে পরিবার থেকে আলাদা করে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে বড় করার মাধ্যমে অজান্তেই তার স্বাভাবিক বিকাশের পথে নতুন সংকট তৈরি করা হচ্ছে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ও গবেষণা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ ও উপযুক্ত জায়গা কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি নিরাপদ, যত্নশীল ও স্থিতিশীল পরিবার। তাই অসহায় শিশুকে সাহায্য করার অর্থ সব সময় তাকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সহায়তা।
২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত লাইবেরিয়ায় কাজ করার সময় পরিবারভিত্তিক শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার একটি উদ্যোগের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। সে সময় প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকা শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, অভিভাবকদের ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রাথমিক অর্থ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া, ইতিবাচক অভিভাবকত্বের দক্ষতা বাড়ানো এবং পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সরকারি ও সামাজিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এর ফলও ছিল ইতিবাচক। যেসব শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতিষ্ঠানে বসবাস করছিল, তাদের অনেকে আবার নিজেদের পরিবারে ফিরে যেতে পেরেছে। তারা স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে এবং নিজেদের পরিচিত সামাজিক পরিবেশের মধ্যেই বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে।
এর আগে অনেক অভিভাবক মনে করতেন, সন্তানকে কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো ছাড়া তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান সব সময় ভালো ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে সেখানে বসবাসের পরিবেশও শিশুদের নিজ বাড়ির চেয়ে উন্নত ছিল না।
এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। অনেক শিশুকে প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ধার করার আগে হয়তো তাদের পরিবারের সমস্যাগুলো সমাধান করাই বেশি জরুরি।
কেন শিশুরা প্রতিষ্ঠানমুখী হয়?
দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধিতা, সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সামাজিক বঞ্চনা শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার অন্যতম কারণ। কোনো কোনো পরিবারের কাছে সন্তানকে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানোই মনে হয় শিক্ষা, চিকিৎসা বা অন্যান্য মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ।
বিশেষ করে জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, এইচআইভি নিয়ে বসবাসকারী শিশু এবং বিবাহের বাইরে জন্ম নেওয়া শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচর্যার ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক তথ্য হলো, বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী বিশ্বের আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকা ৮০ থেকে ৯৬ শতাংশ শিশুর অন্তত একজন জীবিত অভিভাবক রয়েছেন। অর্থাৎ তাদের সবাই প্রকৃত অর্থে এতিম নয়।
এই তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি একজন শিশুর বাবা অথবা মা জীবিত থাকেন এবং পরিবারটি শিশুকে নিরাপদে লালন-পালন করতে পারে, তাহলে তাকে প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করার প্রয়োজন কেন হবে—এই প্রশ্নটি সামনে আসা স্বাভাবিক।
অনেক সময় পরিবারের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে শিশুর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু দারিদ্র্য কোনো শিশুকে তার পরিবার থেকে আলাদা করার যথেষ্ট কারণ হওয়া উচিত নয়। বরং যে সমস্যার কারণে পরিবারটি শিশুর দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, সেই সমস্যার সমাধান করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।
প্রতিষ্ঠান যত ভালোই হোক, পরিবার কি তার বিকল্প হতে পারে?
এতিমখানা প্রতিষ্ঠার পেছনে থাকা মানুষদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের লক্ষ্য থাকে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। অনেক দাতা ও সমাজসেবীও আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন, তাদের অর্থ একটি অসহায় শিশুর জীবন বদলে দিচ্ছে।
কিন্তু সদিচ্ছা থাকলেই কোনো ব্যবস্থা শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো হয়ে যায় না।
একটি শিশুর শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক ও আবেগীয় বিকাশের জন্য প্রয়োজন স্থায়ী সম্পর্ক, পরিচিত মানুষ, নিরাপত্তাবোধ এবং নিয়মিত স্নেহ ও যত্ন। একটি প্রতিষ্ঠানে যত ভালো ব্যবস্থাপনাই থাকুক, সেখানকার কর্মী বা তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক অনেক সময় পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় আবাসিক প্রতিষ্ঠানে থাকার কারণে শিশুদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগীয় বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে। কেভিন ব্রাউনের ২০০৯ সালের গবেষণা ‘দ্য রিস্ক অব হার্ম টু ইয়াং চিলড্রেন ইন ইনস্টিটিউশনাল কেয়ার’-এ বলা হয়েছে, যথাযথ সহায়তা ছাড়া ছয় মাসের বেশি সময় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচর্যায় থাকা শিশুদের বিকাশের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তা অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না।
সমস্যাটি শুধু শৈশবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসা তরুণদের মধ্যে দারিদ্র্য, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, গৃহহীনতা, মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
শিশুদের জন্য ক্ষতিকর প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের দূরে রাখার বিষয়ে ২০০৯ সালে সেভ দ্য চিলড্রেনের একটি প্রতিবেদনের সিদ্ধান্তও ছিল স্পষ্ট—শিশু বেড়ে ওঠার জন্য আবাসিক প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে নিরাপদ বা উপযুক্ত জায়গা নয়।
কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে থাকা শিশুরা সহিংসতা, নির্যাতন, অবহেলা এবং পাচারের মতো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কখনো কখনো যে ব্যক্তিদের ওপর শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাদের মধ্য থেকেও ক্ষতির ঘটনা ঘটতে পারে। কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, কর্মকর্তা কিংবা দর্শনার্থী—কেউই সব সময় ঝুঁকিমুক্ত নয়।
এতিমখানা কি কখনো ব্যবসায়িক কাঠামোয় পরিণত হতে পারে?
আরও একটি জটিল প্রশ্ন রয়েছে। একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন যদি সেখানে কতজন শিশু রয়েছে তার ওপর নির্ভর করে, তাহলে শিশুদের সেখানে রাখার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা তৈরি হতে পারে।
বিভিন্ন দেশে শিশু পরিচর্যা প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির বাইরে পরিচালিত হয়। ফলে শিশুর সুরক্ষার ব্যবস্থা কখনো কখনো অর্থনৈতিক কার্যক্রমের রূপ নিতে পারে।
নেপালের উদাহরণটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ এতিমখানা পুরোপুরি বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন আবার সেখানে থাকা শিশুর সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে শিশুদের পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে।
লাইবেরিয়াতেও একই ধরনের প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। সরকার যখন প্রতিষ্ঠান থেকে শিশুদের পরিবারে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু করে, তখন কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ এতে আপত্তি জানায়। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ বা ছোট হয়ে গেলে সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এখানে শিশুর স্বার্থ আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ এক নয়—এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের চিত্রও কি আলাদা?
বাংলাদেশে এতিম শিশু নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন পরিসংখ্যানে বলা হয়, দেশে এতিম শিশুর সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ লাখ। কিন্তু এই হিসাবের মধ্যে এমন অনেক শিশুও রয়েছেন, যাদের মা অথবা বাবা জীবিত।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে সরকারের পরিচালনায় ৮৫টি ‘শিশু পরিবার’ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ শিশুর থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
এর বাইরে সারা দেশে প্রায় ৪ হাজার বেসরকারি এতিমখানা ও আবাসিক শিশু পরিচর্যা প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র আরও জটিল। কারণ বাংলাদেশে এখনো সব ধরনের আবাসিক শিশু পরিচর্যা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তথ্যভান্ডার নেই।
ফলে দেশে ঠিক কত শিশু আবাসিক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে, তাদের কতজনের বাবা বা মা জীবিত, কতজনকে কী কারণে প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে এবং কতজন শিশুকে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া কঠিন।
এখানেই বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
শুধু খাবার ও আশ্রয় দিলেই শিশুর অধিকার পূরণ হয় না
অনেক এতিমখানা ও আবাসিক শিশু পরিচর্যা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার, প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারী, শিক্ষাসামগ্রী এবং চিকিৎসাসেবার ঘাটতির কথা বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
কোনো শিশুকে তিন বেলা খাবার দেওয়া, স্কুলে পাঠানো এবং মাথা গোঁজার জায়গা করে দেওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিশুর প্রকৃত বিকাশের জন্য আরও অনেক কিছু প্রয়োজন।
তার প্রয়োজন নিরাপদ সম্পর্ক, মানসিক স্থিতি, সামাজিক পরিচয়, নিজের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাস।
একটি প্রতিষ্ঠান এসবের কিছু দিতে পারে। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে একটি শিশুর যে আবেগীয় সম্পর্ক, সেটি পুরোপুরি তৈরি করা অনেক কঠিন।
তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হওয়া উচিত—কতগুলো নতুন এতিমখানা প্রয়োজন, তা নয়; বরং কতগুলো পরিবারকে এমনভাবে সহায়তা করা যায়, যাতে তাদের সন্তানকে এতিমখানায় পাঠানোর প্রয়োজনই না হয়।
পরিবার সব সময় নিরাপদ নয়—এ কথাও মনে রাখতে হবে
তবে পরিবারকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। সব পরিবার শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। কোনো কোনো শিশু নিজ পরিবারেই নির্যাতন, অবহেলা, সহিংসতা বা শোষণের শিকার হয়।
কিছু অভিভাবক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সন্তানকে প্রয়োজনীয় খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা বা নিরাপদ পরিবেশ দিতে পারেন না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিভাবকই শিশুর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে ওঠেন।
এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে শিশুর জন্য নিরাপদ বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা।
তবে সেই বিকল্পের অর্থ সব সময় বড় কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত নয়। আত্মীয়ের কাছে লালন-পালন, পালক পরিবার, ছোট পরিসরের পরিবারসদৃশ আবাসন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দত্তক গ্রহণ—এসব ব্যবস্থাও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
কোনো শিশুকে বিকল্প পরিচর্যায় পাঠানোর আগে তার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, পরিবারের অবস্থা এবং সম্ভাব্য সব বিকল্প মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুর নিজের মতামত শোনা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
আন্তর্জাতিক নীতিও প্রতিষ্ঠানকে শেষ বিকল্প বলছে
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৮ ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখে ‘শিশুদের বিকল্প পরিচর্যার নির্দেশিকা’ গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে শিশুদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ঠেকানো এবং পরিবার থেকে আলাদা হওয়া শিশুদের জন্য নিরাপদ, উপযুক্ত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিচর্যা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই নির্দেশিকার মূল দর্শন হলো, শিশুকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কোনো কারণে পরিবারে রাখা সম্ভব না হলে বিকল্প পরিচর্যা এমন হতে হবে, যা শিশুর নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আবাসিক প্রতিষ্ঠান যদি একেবারেই প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটিও হওয়া উচিত শেষ বিকল্প। আর সেখানে শিশুকে দীর্ঘদিন আটকে না রেখে যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ ও পরিবারসদৃশ পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রয়োজন দক্ষ সমাজকর্মী, পর্যাপ্ত অর্থ, স্পষ্ট আইন, ন্যূনতম পরিচর্যার মানদণ্ড, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহি।
ইন্দোনেশিয়া, জর্জিয়া ও লাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এসব নীতির আলোকে শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে। ধীরে ধীরে তারা বড় আবাসিক প্রতিষ্ঠাননির্ভর ব্যবস্থা থেকে পরিবারভিত্তিক পরিচর্যার দিকে এগিয়েছে।
বাংলাদেশের আইন আছে, বাস্তবায়ন কতটা?
বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩-তেও এমন শিশুদের জন্য একটি বিস্তৃত বিকল্প পরিচর্যা ব্যবস্থা তৈরির কথা বলা হয়েছে, যারা নিরাপদে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে পারে না।
কোনো শিশুকে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর আগে তার পারিবারিক পরিস্থিতি যাচাই করে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে কোন ব্যবস্থা সবচেয়ে উপযুক্ত, তা বিবেচনা করার কথা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে এই ব্যবস্থাগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ এখনো হয়নি। অনেক শিশুকে যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
এটি শুধু একটি প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা জড়িয়ে আছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন পরিবারভিত্তিক পরিচর্যার দিকে গুরুত্ব বাড়ছে, বাংলাদেশ তখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সমাধানের ওপর নির্ভর করছে। ফলে আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, সেটি দ্রুত কমানো প্রয়োজন।
অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
শিশুদের জন্য ব্যয় করা অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন আফ্রিকান দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শিশুকে প্রতিষ্ঠানে রাখার ব্যয় তার নিজের পরিবারকে সহায়তা করার তুলনায় ছয় থেকে দশ গুণ বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে যদি একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার বদলে দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি সহায়তা করা যায়, তাহলে আরও বেশি শিশুকে নিরাপদ পরিবারে রাখা সম্ভব হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা, অভিভাবকদের দক্ষতা উন্নয়ন, শিশুদের জন্য দিবাকালীন পরিচর্যা, সমাজকর্মীর সহায়তা এবং শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় সহজ প্রবেশাধিকার বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
কোনো পরিবার যদি শুধু অর্থের অভাবে সন্তানকে এতিমখানায় পাঠাতে বাধ্য হয়, তাহলে শিশুটিকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে আনার আগে পরিবারটির সেই অর্থনৈতিক সংকট সমাধান করাই বেশি যৌক্তিক।
দানের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন দরকার
বাংলাদেশে এতিমখানায় দান করার একটি দীর্ঘ সামাজিক সংস্কৃতি রয়েছে। ধর্মীয় ও মানবিক বিবেচনায় মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে অর্থ, খাবার, পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে থাকেন।
এই সহায়তার মানবিক মূল্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু দান করার আগে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—এই অর্থ কি শিশুকে তার পরিবারের কাছে নিরাপদে রাখতে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব?
যদি কোনো পরিবার অর্থের অভাবে সন্তানকে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে বাধ্য হয়, তাহলে সেই পরিবারকে নিয়মিত সহায়তা করলে হয়তো শিশুটিকে প্রতিষ্ঠানেই পাঠাতে হবে না।
অর্থাৎ সাহায্যের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখা নয়; বরং শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
এখন কী করা দরকার?
বাংলাদেশে পরিবারভিত্তিক শিশু পরিচর্যা শক্তিশালী করতে প্রথমেই একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি। কোন প্রতিষ্ঠানে কত শিশু রয়েছে, তাদের বয়স কত, তাদের বাবা-মা জীবিত কি না, কেন তারা প্রতিষ্ঠানে এসেছে এবং তাদের পরিবারে ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা কতটা—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।
এর পাশাপাশি প্রতিটি শিশুর পৃথক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে দক্ষ সমাজকর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করার আগে পরিবারকে সহায়তা করার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
দরিদ্র পরিবারকে নগদ সহায়তা, অভিভাবকদের ইতিবাচক সন্তান লালন-পালনের প্রশিক্ষণ, শিশুদের জন্য দিবাকালীন পরিচর্যা, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিশুকেই প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে রাখা সম্ভব।
ইতিমধ্যে যেসব শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার। যেখানে পরিবারে ফিরে যাওয়া নিরাপদ এবং শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেখানে পুনর্মিলনের উদ্যোগ নিতে হবে।
অন্যদিকে যেসব শিশু পরিবারে ফিরতে পারবে না, তাদের জন্য নিরাপদ ও পরিবারসদৃশ বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কঠোর নিয়ম, নিয়মিত পরিদর্শন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
আমাদের সহানুভূতির ধরন বদলাতে হবে
শিশুদের জন্য কাজ করার সময় সবচেয়ে কঠিন কাজটি হলো নিজেদের ভালো উদ্দেশ্যকে প্রশ্ন করা। আমরা যখন কোনো এতিমখানায় দান করি, তখন আমাদের উদ্দেশ্য থাকে একজন শিশুকে সাহায্য করা। কিন্তু সেই সাহায্য যদি দীর্ঘমেয়াদে শিশুটিকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, তাহলে আমাদের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দাতা ব্যক্তি এবং স্থানীয় সমাজ—সবার ভূমিকা রয়েছে এই পরিবর্তনে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন নতুন আবাসিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণকে শিশু কল্যাণের প্রধান সমাধান হিসেবে না দেখা। বরং পরিবারগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য অর্থ ও সম্পদ বিনিয়োগ করা।
বাংলাদেশ সরকারের সামনে তাই কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন থাকা দরকার। পরিবার ভেঙে যাওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে আমরা কতটা সহায়তা করছি? পরিবারে থাকা সম্ভব নয় এমন শিশুদের জন্য কি পর্যাপ্ত ও নিরাপদ বিকল্প পরিচর্যা ব্যবস্থা রয়েছে? প্রতিটি শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ কি সত্যিই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে আছে? নাকি আমরা প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখাকেই শিশুর কল্যাণের সমার্থক ধরে নিয়েছি?
একই প্রশ্ন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
কোনো এতিমখানায় অর্থ দেওয়ার আগে যদি একবার ভাবি—এই অর্থ দিয়ে কি একটি দরিদ্র পরিবারকে এমনভাবে সহায়তা করা সম্ভব, যাতে শিশুটিকে পরিবার ছেড়ে যেতে না হয়—তাহলে হয়তো দানের অর্থ আরও কার্যকর হয়ে উঠবে।
শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় উপহার সব সময় একটি ভবন নয়। কখনো কখনো সেটি হতে পারে এমন একটি পরিবার, যেখানে সে নিরাপদে থাকতে পারে, ভালোবাসা পেতে পারে, স্কুলে যেতে পারে এবং নিজের পরিচিত মানুষগুলোর সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারে।
তাই বাংলাদেশের শিশু কল্যাণনীতিতে এখন প্রশ্নটি হওয়া উচিত ‘আর কতটি এতিমখানা দরকার’ নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘কী করলে একটি শিশুকেও অপ্রয়োজনে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে না?’
কারণ শিশুকে পরিবার থেকে সরিয়ে সাহায্য করা আর শিশুকে তার পরিবারের সঙ্গে রেখে সাহায্য করা—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক বড়। আর শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ যদি সত্যিই আমাদের লক্ষ্য হয়, তাহলে সেই পার্থক্যটি বুঝে নেওয়ার সময় এখনই।

