পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পৌঁছে দিতে নির্মাণ করা হচ্ছে একাধিক সঞ্চালন লাইন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। প্রকল্পটির বড় অংশ ভারতের সঙ্গে করা ঋণ চুক্তির আওতায় বাস্তবায়নের কথা থাকলেও নদী পারাপারের একটি অংশ সেই অর্থায়ন থেকে বাদ দেওয়ার পর প্রকল্পের পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন এসেছে। রুট পরিবর্তনের ফলে সঞ্চালন লাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ কিলোমিটার কমেছে। একই সঙ্গে উন্মুক্ত দরপত্রে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ঠিকাদার নির্বাচনে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
রূপপুরের বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভির ছয়টি দ্বৈত ও একক সার্কিটের সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি। এসব অবকাঠামো নির্মাণে প্রথমে মোট ১০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে ভারতের ঋণ থেকে ৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা পাওয়ার কথা ছিল। অবশিষ্ট অর্থ দেওয়ার কথা ছিল পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ ও সরকারের।
তবে প্রকল্পের ষষ্ঠ প্যাকেজের আওতায় থাকা নদী পারাপারের কাজের দরপত্রে সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দর প্রকল্পে নির্ধারিত অর্থের তুলনায় বেশি হওয়ায় ওই অংশটি ভারতীয় ঋণ থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নদী পারাপারের কাজটি আলাদাভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ অংশে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল। পাশাপাশি আগের পরিকল্পনা থেকে সরে সঞ্চালন লাইনের পথও পরিবর্তন করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ভারতীয় ঋণ থেকে নদী পারাপারের অংশটি বাদ দেওয়ায় একদিকে বিদেশি ঋণের কিছু কঠিন শর্ত থেকে বেরিয়ে আসা গেছে, অন্যদিকে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অন্যান্য দেশ থেকেও সরাসরি আমদানির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতীয় ঋণের আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মালামাল ভারত থেকেই কেনার বাধ্যবাধকতা ছিল। নদী পারাপারের অংশটি ওই ঋণ থেকে বাদ পড়ায় সেই শর্তও আর প্রযোজ্য থাকছে না। ফলে তুলনামূলক কম ব্যয়ে অন্যান্য দেশ থেকে প্রয়োজনীয় মালামাল সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয়ও কিছুটা কমেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবে মোট ব্যয় কমিয়ে ৮ হাজার ৬৫১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শুরুতে ভারতীয় ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। সংশোধনের পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ভারতীয় ঋণের পরিমাণ কমেছে ২ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। প্রকল্প থেকে নদী পারাপারের অংশ বাদ দেওয়া এবং পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার ফলেই এই ব্যয় কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশোধিত পরিকল্পনায় যমুনা নদী পার হওয়ার পথেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে মানিকগঞ্জের দিক দিয়ে সঞ্চালন লাইন যাওয়ার কথা থাকলেও এখন তা টাঙ্গাইলের ওপর দিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে নদী পারাপারের দৈর্ঘ্য আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে আসবে। ফলে এ অংশে ব্যয়ও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্প সংশোধনের সময় বিদেশি ঋণের শর্ত ও চুক্তির বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দ্বৈত সার্কিটের পরিবর্তে কোথাও একক সার্কিট করা হলে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সঞ্চালন লাইনের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়ায় কিছু লাইনে অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং অন্য কিছু দ্বৈত লাইনে সঞ্চালনের সক্ষমতা বাড়বে। ফলে সংশোধনের কারণে প্রকল্পের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
রূপপুর-ধামরাই ১৫২ কিলোমিটার দ্বৈত সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ছিল মূল পরিকল্পনার অন্যতম অংশ। এই লাইনের পথ মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়, ঘিওরসহ মোট পাঁচটি উপজেলা অতিক্রম করে যমুনা নদীতে ১৩ কিলোমিটার নদী পারাপারের কথা ছিল। পরবর্তীতে ভারতীয় ঋণ থেকে ওই অংশ বাদ দেওয়ার পর পুরো পথটি পুনর্বিবেচনা করা হয়। মানিকগঞ্জের পরিবর্তে টাঙ্গাইলের ওপর দিয়ে যমুনা নদী পার হওয়ার নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে সঞ্চালন লাইনের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ কিলোমিটার কমে এসেছে।
সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের তথ্যেও একাধিক সঞ্চালন লাইনের দৈর্ঘ্য কমানোর বিষয়টি দেখা গেছে। রূপপুর-ঢাকা ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন ১৫৪ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ১৫০ কিলোমিটার করা হয়েছে। আমিনবাজার-কালিয়াকৈর ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। রূপপুর-বগুড়া ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনের দৈর্ঘ্য ১০২ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৮৯ কিলোমিটারে আনা হয়েছে। আবার যেসব স্থানে দ্বৈত সার্কিট করার পরিকল্পনা ছিল, সেখানেও কিছু ক্ষেত্রে একক সার্কিট করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ১২টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের সংযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা কমিয়ে সাতটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে।
তবে প্রকল্পের ব্যয় কমাকে সরাসরি বড় ধরনের সাশ্রয় হিসেবে দেখছেন না পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান। তিনি জানিয়েছেন, প্রকল্পের কিছু অংশে ব্যয় কমেছে ঠিকই, তবে ডলারের বিনিময়মূল্যের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, সেটি বিবেচনায় নিলে প্রকৃত সাশ্রয়ের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের এপ্রিলে। প্রকল্পটি শেষ করার প্রাথমিক সময়সীমা ছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বর। তবে কভিড মহামারীসহ বিভিন্ন কারণে চার দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এখনো নদী পারাপারের কিছু কাজ বাকি রয়েছে।
রূপপুরের সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণের বড় একটি অংশের কাজ পেয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানি। প্রকল্প অনুমোদনের পর অর্থছাড়সহ নানা কারণে শুরু থেকেই কাজে বিলম্ব দেখা দেয়। পরে কভিড মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রকল্পের প্রয়োজনীয় মালামাল সংগ্রহেও জটিলতা তৈরি হয়। ৫ আগস্ট জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় সঞ্চালন খাতে কাজ করা ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানির কর্মীদের একটি অংশ বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। এতে প্রকল্পের কাজ আরও ধীর হয়ে পড়ে। পরে অবশ্য এসব কোম্পানির কর্মীদের অনেকে আবার সঞ্চালন খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজে ফিরেছেন।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে মোট ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন করছে রাশিয়া। প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে রুশ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রোসাটম। রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি উৎপাদনে গেলে সেই বিদ্যুৎ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিতে যে বিশাল সঞ্চালন অবকাঠামো প্রয়োজন, মূলত সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘ এসব সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে।

