দারিদ্র্যের নির্মম আঘাতে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারিয়েছেন একজন মা। দুই সন্তান নিয়ে বর্তমানে তাঁর ঠিকানা খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশের একটি খোলা জায়গা। ঘরভাড়া পরিশোধ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের মাথার চুল বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার একটি গ্রামের এই ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর মর্মবেদনার সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়রা জানান, ওই নারী আগে একটি ভাড়া করা ঝুপড়ি ঘরে দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। দীর্ঘদিন ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় সেই আশ্রয়টুকুও হারাতে হয় তাঁকে। এরপর সন্তানদের নিয়ে রেললাইনের পাশে একটি সরকারি জমিতে আশ্রয় নেন তিনি।
বর্তমানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় রেলব্রিজের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন তিনি। তবে অর্থাভাবে ঘরটি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি—কয়েক মাস ধরে কেবল বাঁশের কাঠামোটিই দাঁড়িয়ে আছে। টিন ও বেড়া না থাকায় প্রখর রোদ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করেই দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।
স্থানীয় এক নারী জানান, মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় ওই নারী একসময় পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন হঠাৎ দেখা যায় তাঁর মাথায় চুল নেই। জিজ্ঞেস করলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, ঘরভাড়ার পাঁচশ টাকা পরিশোধ করতে নিজের চুল বিক্রি করে দিয়েছেন।
স্থানীয় আরেকজন বাসিন্দা বলেন, দুই সন্তান নিয়ে অত্যন্ত করুণ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি, এবং এলাকাবাসী সরকারের কাছে দ্রুত একটি ঘরের ব্যবস্থা করার আবেদন জানাবেন বলে জানান। আরেকজন প্রতিবেশী বলেন, বাঁশের কাঠামো ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে, এখন শুধু টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা হলেই একটি সম্পূর্ণ ঘর দাঁড় করানো সম্ভব হবে। এলাকার সচ্ছল ও মানবিক মানুষেরা এগিয়ে এলে দুই সন্তান নিয়ে অন্তত মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই হবে তাঁদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের প্রবেশমুখে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই বাঁশের কাঠামো, যেখানেই দুই সন্তান নিয়ে বসবাসের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। কিন্তু টিন ও বেড়ার অভাবে সেটি এখনো বসবাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
ওই নারী বলেন, দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিনের কষ্ট সহ্য করেন তিনি। ঘর নেই, খাওয়ারও কষ্ট আছে, নিরুপায় হয়েই তিনি চুল বিক্রি করেছেন। তিনি সরকারের কাছে সহায়তা চেয়েছেন, যাতে সন্তানদের নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে পারেন।
এলাকাবাসীর দাবি, এই পরিবারের মতো অসহায় মানুষদের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় দ্রুত ঘরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন এই মা। তাঁর চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়—মাথার ওপর একটুখানি টিনের ছাউনি, যেখানে বৃষ্টির দিনে সন্তানদের ভিজতে হবে না, আর রাতে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন তাঁরা।
একজন মায়ের ঘরভাড়া মেটাতে চুল বিক্রি করে দেওয়ার এই ঘটনা কেবল দারিদ্র্যের নির্মমতাই নয়, বরং সমাজের অসহায় মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

