জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও এর রেশ এখনো কাটেনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে। ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের অভিযোগে বাহিনীর দেড় হাজারের কাছাকাছি সদস্য এখন ফৌজদারি মামলার আসামি। এর প্রভাবে পুলিশের বিভিন্ন স্তরে দেখা দিয়েছে ব্যাপক অস্থিরতা—কেউ কারাগারে, কেউ পলাতক, আবার কাউকে পাঠানো হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসরে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত মামলায় মোট ১ হাজার ৪৯০ জন পুলিশ সদস্যের নাম আসামি হিসেবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ৬৮ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আর ৫৭ জন এখনো পলাতক অবস্থায় আছেন। পাশাপাশি ১৪১ জন সদস্যকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং ১৪২ জনকে ওএসডি বা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে। কর্মস্থল থেকে পালানোর অভিযোগে সাময়িক বরখাস্তের মুখে পড়েছেন আরও ৯৩ জন।
এই ব্যাপক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে উঠে এসেছে ভিন্নমতও। শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, ঘটনার সঙ্গে প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই অনেককে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাঁদের ভাষ্যে, কেউ কেউ ঘটনার দিন কর্মস্থলেই ছিলেন না, কারও নাম ডিউটির তালিকাতেই ওঠেনি, আবার কেউ তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে। এই অংশের অভিযোগ, পুলিশের ভেতরকার দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবও এসব মামলায় ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে বাহিনীর একটি অংশ মনে করছে, অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার বা আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে তাঁরাও একমত যে, শাস্তির প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন সঠিক তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, যাতে নির্দোষ কেউ ভুক্তভোগী না হন।
গ্রেপ্তার হওয়া ৬৮ জনের তালিকায় রয়েছেন সাবেক মহাপরিদর্শকসহ (আইজিপি) অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং থানা পর্যায়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের ব্যক্তিরাও। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারা দেশে মোট ১৩৭ জন সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, যাঁদের মধ্যে ৮০ জন পরে কাজে ফিরে এসেছেন। বাকি ৫৭ জনের মধ্যে ডিআইজি থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পলাতক সদস্যদের মধ্যে যাঁদের চাকরির মেয়াদ ২৫ বছরের কম, তাঁদের বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে বরখাস্তের প্রক্রিয়া চলছে। আর ২৫ বছরের বেশি চাকরির বয়স হলে সরাসরি বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
অভ্যুত্থানের পর থেকে ধাপে ধাপে ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে পাঠানো হয় ৫৬ জনকে, আর নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের পর আরও ৮৫ জনকে একই প্রক্রিয়ায় অবসরে পাঠানো হয়। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই আরও ১৭ জন কর্মকর্তাকে এই তালিকায় যুক্ত করা হয়।
খোন্দকার রফিকুল ইসলাম আরও জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং যাঁদের কারাদণ্ড হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলমান।
এ ছাড়া বিভিন্ন পদের আরও ৮২ জনকে ওএসডি করা হয়েছে এবং সব মিলিয়ে ১৪২ জনকে বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী পলায়নের অভিযোগে ৯৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, যার মধ্যে রয়েছেন ৭ জন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৩২ জন পুলিশ সুপার, ২৫ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং ১৭ জন সহকারী পুলিশ সুপার। এর বাইরে আরও ২৬ জনকে বিভিন্ন ইউনিট থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
গত বছরের ৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, কর্মস্থল ছেড়ে পালানোর অভিযোগে ডিআইজি থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার ৪০ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের বিপিএম-পিপিএম পদক প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাহিনীর ভেতরেই মতপার্থক্য রয়েছে। শাস্তি পাওয়া কয়েকজনের দাবি, ঘটনার সময় তাঁরা আদৌ ঘটনাস্থলে ছিলেন না বা ডিউটিতেও ছিলেন না। তাঁদের অভিযোগ, তৎকালীন প্রভাবশালী কিছু পুলিশ কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবেই তাঁদের নাম মামলায় যুক্ত হয়েছে, যার পরিণতিতে পরবর্তীতে বরখাস্ত, ওএসডি বা অবসরের সিদ্ধান্ত আসে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে উপকমিশনার হিসেবে কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি মশিউর রহমানসহ চারজন উপকমিশনার এবং সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের তিনজন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তার নাম নাকি সেদিনের ডিউটি তালিকাতেই ছিল না—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবু তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা হয়েছে। বর্তমানে মশিউর রহমানসহ দুজন কারাগারে, দুজন রেঞ্জ কার্যালয়ে সংযুক্ত, একজন পলাতক এবং আরেকজন নিয়মিত দায়িত্বে বহাল আছেন।
বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্তদের তালিকায় থাকা কয়েকজনের সহকর্মীরা দাবি করেছেন, এই কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই কখনো জেলা পুলিশ সুপার বা কোনো স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বই পালন করেননি। এই তালিকায় নাম উঠে এসেছে ডিআইজি কাজী জিয়া উদ্দিন, ডিআইজি আবদুল্লাহিল বাকি এবং অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানার। সহকর্মীদের ভাষ্যে, দীর্ঘ পেশাদার জীবনে পরিচিত এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানে সরাসরি জড়িত থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। বরং প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের প্রভাব বা অভ্যন্তরীণ পেশাগত দ্বন্দ্বই তাঁদের এই পরিণতির কারণ বলে মনে করছেন তাঁরা।
সাবেক আইজিপি মো. আবদুল কাইয়ুম এ প্রসঙ্গে বলেন, যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে যথাযথ অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাই হওয়া জরুরি, যাতে একজন নির্দোষ ব্যক্তিও অন্যায়ভাবে শাস্তি না পান এবং কেউ যেন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত বা অহেতুক চাকরিচ্যুত না হন।
পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে অবশ্য এসব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
সার্বিক চিত্র থেকে স্পষ্ট, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পুলিশ সংস্কার প্রক্রিয়া একদিকে যেমন অতীতের বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিতের চেষ্টা করছে, তেমনি অন্যদিকে তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নও তৈরি হয়েছে বাহিনীর অভ্যন্তরেই। প্রকৃত দোষীদের বিচারের পাশাপাশি নির্দোষ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারলে বাহিনীর মনোবল ও কার্যকারিতা—উভয়ই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

