দেশের জাতিগোষ্ঠী মানুষের অধিকার, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা সমস্যাগুলো আজও পুরোপুরি সমাধানের মুখ দেখেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ মীমাংসা এবং পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের গতি থমকে আছে বহুদিন ধরেই। অন্যদিকে সমতলের জাতিগোষ্ঠীর মানুষও প্রতিনিয়ত লড়ছেন ভূমি দখল, উচ্ছেদ আতঙ্ক আর দীর্ঘ আইনি জটিলতার সঙ্গে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁদের প্রকৃত অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এমনই এক বাস্তবতার মধ্যে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্যে আদিবাসী জীবনধারা ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দিবসের ঠিক আগমুহূর্তে একটি ঘটনা রাষ্ট্রীয় নীতির অসামঞ্জস্যকে নতুন করে সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার দুই বিদেশি কর্মকর্তার একটি নির্ধারিত পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর সম্প্রতি বাতিল হয়ে গেছে। কৃষি ও পর্যটন খাতের একটি উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে দেখতে চলতি মাসের শুরুতে রাঙামাটি ও বান্দরবানে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। সংস্থার ঢাকা কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুমতি মেলেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রও নিশ্চিত করেছে।
পার্বত্য এলাকায় বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশে বিশেষ অনুমতির নিয়মটি দীর্ঘদিনের পুরোনো একটি বিধান। তবে সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেছেন, এমন ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দল দেশকে বহু জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির এক বর্ণিল দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু পাহাড় ও সমতলের বাস্তব চিত্র সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কতটা মিলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর সমস্যাগুলোর একটি ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা। পার্বত্য চুক্তির দুই বছর পর গঠিত হয়েছিল ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন। খাগড়াছড়িতে অবস্থিত এই কমিশনের কার্যালয় সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা ভবনটির প্রধান ফটকই বন্ধ, ভেতরে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখাও মেলেনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কার্যালয়টি বেশির ভাগ সময়ই এভাবে বন্ধ থাকে।
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আগামী অর্থবছরের প্রকল্প নিয়ে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কোনো পাহাড়ি প্রতিনিধিই উপস্থিত ছিলেন না। আরও লক্ষণীয় বিষয়, মন্ত্রণালয় গঠনের পর এই প্রথমবারের মতো এর নেতৃত্বে কোনো পাহাড়ি ব্যক্তি নেই। এ বছরের শুরুতে একজন পাহাড়ি নেতাকে মন্ত্রী করা হলেও নানা মতপার্থক্যের জেরে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি মাসকয়েক আগে পদ ছেড়ে দেন।
চুক্তি সম্পাদনকারী সংগঠনের এক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ছয় মাসে ভূমি বিরোধ কিংবা পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই করা হয়নি। তাঁর মতে, মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একজন অপাহাড়ি ব্যক্তিকে বসানো সরাসরি পার্বত্য চুক্তির চেতনার পরিপন্থী এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বার্থবিরোধী।
শুধু পাহাড় নয়, দেশের উত্তরাঞ্চল, ময়মনসিংহ ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকার জাতিগোষ্ঠী সংগঠনগুলোও দীর্ঘদিন ধরে পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, ভূমি দখল, জাল দলিল তৈরি, উচ্ছেদ এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতার কারণে বহু পরিবার ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অথচ এই দাবি বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।
টাঙ্গাইলের মধুপুরে গারো সম্প্রদায়ের মানুষ এখনো ভূমি উচ্ছেদের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বন বিভাগের সঙ্গে তাঁদের ভূমি বিরোধ ও একাধিক মামলা এখনো চলমান। রাজশাহী ও দিনাজপুরেও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভূমিহীনতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। সিলেট অঞ্চলেও গারো, পাত্র এবং চা-বাগান শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ভূমি সমস্যা দীর্ঘদিনের।
মধুপুরের একটি স্থানীয় আদিবাসী উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি জানিয়েছেন, বন সংক্রান্ত মামলা ও ভূমি জটিলতা সমাধানে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া তাঁরা পাননি।
সম্প্রতি সমতলের জাতিগোষ্ঠীর কয়েকজন প্রতিনিধি সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছেন একটি জাতীয় ফোরামের সাধারণ সম্পাদক। ওই বৈঠকে তাঁদের জন্য একটি পৃথক উন্নয়ন অধিদপ্তর গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে বলে তিনি জানান।
ভূমি অধিকার, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা সামগ্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান উদ্যোগ ছাড়া বহু জাতিসত্তার সমন্বিত এক জাতি গঠনের স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীদের অনেকেই। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একজন বিশেষ সহকারী মন্তব্য করেছেন, নৃগোষ্ঠীর মানুষদের উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং সেগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
তবে পার্বত্য অঞ্চলের একজন প্রথাগত নেতৃত্বাধীন সার্কেল প্রধানের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর ভাষায়, বহু জাতিসত্তার সমন্বিত জাতি গঠনের তেমন কোনো বাস্তব প্রচেষ্টা তিনি লক্ষ করছেন না। চলাফেরার স্বাধীনতা, মানবাধিকার কিংবা ভূমি অধিকারের প্রশ্নে পাহাড় বা সমতলের জাতিগোষ্ঠী মানুষের অধিকার নিশ্চিতে কার্যকর কোনো তৎপরতাও তিনি দেখতে পাচ্ছেন না।
সামগ্রিক চিত্র থেকে স্পষ্ট, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বহু জাতিসত্তার সহাবস্থান নিশ্চিতের যে অঙ্গীকার বারবার উচ্চারিত হয়েছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো সীমিত। ভূমি কমিশনের কার্যক্রম স্থবির থাকা, নীতিনির্ধারণী সভায় জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের সফরে বাধা—এসব ঘটনা একসঙ্গে ইঙ্গিত দেয় যে অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিছক প্রতিপাদ্য ঘোষণা বা আনুষ্ঠানিক দিবস উদযাপনের বাইরে গিয়ে ভূমি অধিকার, চুক্তি বাস্তবায়ন ও প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রকৃত আস্থা অর্জন কঠিন হয়ে থাকবে।

