সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণার একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে বিচার বিভাগের বেতন কমিশন নিয়ে নতুন একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছে সরকার। তবে এই সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা—তাঁদের অনেকেই একে সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিচার বিভাগীয় কর্মচারীদের বেতন কমিশনের প্রতিবেদন খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তৈরির জন্য অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীকে প্রধান করে আটজনের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে স্বরাষ্ট্র, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, মহিলা-শিশু ও সমাজকল্যাণ এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের পাশাপাশি রাখা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন উপদেষ্টা এবং জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীদেরও। গত ৬ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কমিটি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সদস্য যুক্ত করতে পারবে এবং প্রয়োজনমতো বৈঠকে বসবে, আর এর কার্যক্রমে সাচিবিক সহায়তা দেবে অর্থ বিভাগ। প্রজ্ঞাপনেই স্পষ্ট করা হয়েছে যে কমিটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
বিচারকদের বেতন কাঠামো নিয়ে এই নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি আসলে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল আলোচিত নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের বড় প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। মূলত জাতীয় বেতন কমিশন, বিচার বিভাগীয় বেতন কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন সংক্রান্ত কমিটি—এই তিনটি প্রতিবেদন একত্রে পর্যালোচনা করে নতুন বেতন কাঠামোর একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এ জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে আগেই একটি পৃথক উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠিত হয়েছিল, যারা ইতিমধ্যে তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করে ফেলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঠিক এই পর্যায়ে এসে বিচার বিভাগের বেতন কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে আলাদাভাবে নতুন সুপারিশ তৈরির এই উদ্যোগকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন সরকারি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন যুগ্মসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি যেহেতু ইতিমধ্যে জাতীয়, বিচার বিভাগীয় ও সামরিক বাহিনীর বেতন প্রতিবেদনের সমন্বিত পর্যালোচনা সম্পন্ন করে ফেলেছে, তাই একেবারে শেষ মুহূর্তে নতুন করে আরেকটি কমিটি গঠন করাটাকে সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না তাঁর কাছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা আগেই দিয়েছিল সরকার, তবে এখনো তা চূড়ান্ত রূপ পায়নি। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজস্ব আদায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই বিষয়ে সরকার এখন পর্যন্ত বেশ সতর্ক অবস্থানেই রয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আসছে অক্টোবরে সংস্থাটির সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতন কাঠামো আংশিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রায় চুয়াল্লিশ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে যে বিপুল অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হবে, সেটিই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, জাতীয় বেতন কমিশন চলতি বছরের জানুয়ারিতেই তাদের প্রতিবেদন তৎকালীন সরকারের কাছে জমা দিয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা একশ থেকে একশ চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল, যেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন বাড়িয়ে বিশ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন বাড়িয়ে এক লাখ ষাট হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এই সুপারিশ পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে—যা বাস্তবায়নের পথে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

