অসুস্থ হলে চিকিৎসক যে ওষুধ লিখে দেন, তা কিনতেই হয়—দাম যতই হোক না কেন। বিশেষত জীবন বাঁচায় এমন ওষুধ বা দীর্ঘমেয়াদে খেতে হয় এমন ওষুধের দাম বাড়লে সরাসরি চাপ পড়ে রোগীর পরিবারের সংসারের বাজেটে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে মানুষের নিজের পকেট থেকে ব্যয়ের হার তুলনামূলক বেশি, আর তার সিংহভাগই যায় ওষুধ কিনতে। এ কারণে কোন ওষুধ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়, তার দাম কেমন হওয়া উচিত এবং তা বাজারে সহজলভ্য কি না—এই প্রশ্নগুলো কেবল ওষুধ শিল্পের নিজস্ব বিষয় নয়, বরং তা সরাসরি জড়িত সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের সঙ্গে। এই বাস্তবতা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা’ এবং এই তালিকাভুক্ত ওষুধের দাম সরকার নির্ধারণ করবে কি না—এই প্রশ্নটি বহু বছর ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
সম্প্রতি সরকার ২০২৬ সালের জন্য প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ওষুধের দামের ওপর থেকে সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ উঠে গেছে—পুরোনো কিছু ব্যবস্থা এখনো কার্যকর আছে এবং তালিকা নতুন করে সাজানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
মানুষের সবচেয়ে মৌলিক ও জরুরি স্বাস্থ্য চাহিদা মেটায় এমন ওষুধকেই বলা হয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ। সাধারণ জ্বর বা পেটের পীড়া থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, হৃদরোগ কিংবা ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ওষুধও এই তালিকায় থাকতে পারে। একটি দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন রোগ বিবেচনা করে, সেসব রোগে সবচেয়ে কার্যকর, নিরাপদ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী ওষুধ যাচাই করে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এর মূল লক্ষ্য একটাই—প্রয়োজনীয় ওষুধ যেন সবসময় বাজার ও সরকারি হাসপাতালে পাওয়া যায়, আর তার দাম যেন সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকে।
১৯৭৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রথম এই ধারণা চালু করে, মূলত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কম খরচে সহজলভ্য করার লক্ষ্যে। সংস্থাটির প্রথম তালিকায় প্রায় দুইশটি জেনেরিক ওষুধ স্থান পেয়েছিল, এবং প্রতিটি দেশকে নিজস্ব প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নিজেদের তালিকা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর থেকে প্রতি দুই বছর পরপর তালিকাটি হালনাগাদ করা হচ্ছে; সর্বশেষ সংস্করণে রয়েছে পাঁচ শতাধিক ওষুধ, আর শিশুদের জন্য আলাদা তালিকায় প্রায় সাড়ে তিনশ। বর্তমানে দেড় শতাধিক দেশ নিজেদের তালিকা তৈরিতে এই কাঠামো অনুসরণ করে থাকে।
স্বাধীনতার পর দেশে হাজার হাজার ধরনের ওষুধ বাজারে পাওয়া যেত, যার একটি বড় অংশই ছিল অকার্যকর বা অপ্রয়োজনীয়, অথচ দাম ছিল চড়া। অন্যদিকে জীবনরক্ষাকারী মৌলিক ওষুধেরই ছিল ঘাটতি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশির দশকের গোড়ায় সরকার দেশের প্রথিতযশা চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে, যাদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত হয় ঐতিহাসিক জাতীয় ওষুধ নীতি। এই নীতির আওতায় প্রথমবারের মতো দেড়শটি প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে গড়ে তোলা হয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা, আর প্রায় সতেরোশ ক্ষতিকর ও অকার্যকর ওষুধ একযোগে নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে ব্র্যান্ড নামের বদলে কম দামে জেনেরিক নামে ওষুধ বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হয়, যা পরবর্তীতে দেশীয় ওষুধ শিল্পের বিকাশ এবং রপ্তানি সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরবর্তী কয়েক দশকে তালিকাটি একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি একটি তালিকায় ছিল ১১৭টি ওষুধ, যা পরে দুই হাজারের দশকে সংশোধিত নীতিতে তালিকাবিহীন হয়ে যায়। এরপর নতুন করে দুইশর বেশি ওষুধ নিয়ে একটি জাতীয় তালিকা তৈরি হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ২০১৬ সালে ফের প্রায় তিনশর কাছাকাছি ওষুধ নিয়ে তালিকা তৈরি হয়। তবে বাস্তবতা হলো, নব্বইয়ের দশকের একটি আদেশের কারণে এখনো সরকার মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার রাখে।
চলতি বছরের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার তালিকাটি বড় পরিসরে সাজিয়ে প্রায় তিনশর কাছাকাছি ওষুধ যুক্ত করে, যার মধ্যে ছিল ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও সংক্রামক রোগের ওষুধও। পরিকল্পনা ছিল এসব ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সরকার নির্ধারণ করবে, পাশাপাশি অতালিকাভুক্ত প্রায় এগারোশ ওষুধের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দাম ওঠানামার সুযোগ রাখা হবে। প্রতিটি ওষুধ কোম্পানিকে তাদের মোট উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট অংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ হিসেবে তৈরি করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি মন্ত্রিসভা এই সংশোধিত তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর পেছনে মূল কারণ আইনি জটিলতা—প্রচলিত ওষুধ ও প্রসাধনী আইন অনুযায়ী তালিকা প্রণয়নের আগে একটি নির্দিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও তা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলাও এখনো বিচারাধীন। জুন মাসে সেই উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হওয়ায় এখন আইনি প্রক্রিয়া মেনে নতুন তালিকা প্রণয়নের পথ খুলেছে বলে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের এক সাবেক পরিচালকের মতে, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন তালিকা বাতিল করাটা যুক্তিসঙ্গত হয়নি। তার ভাষ্য, তালিকা তৈরির মূল উদ্দেশ্যই ছিল প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং দাম সহনীয় রাখা—কিন্তু এখন এর বিকল্প কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, আইনি কারণে আগের তালিকা প্রত্যাহারের প্রয়োজন থাকতে পারে, তবে জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে নতুন ও কার্যকর তালিকা তৈরিতে যেন অহেতুক বিলম্ব না হয়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
ওষুধ প্রচলিত অর্থে কোনো সাধারণ পণ্য নয়। খাবার বা পোশাক কয়েকদিন না কিনলেও চলে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ নিয়মিত না খেলে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে দাম বাড়লেও রোগীর সামনে তা কেনা ছাড়া বিকল্প থাকে না, আর বাজারকে সম্পূর্ণভাবে চাহিদা-জোগানের ওপর ছেড়ে দিলে রোগীর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
উক্ত বিশেষজ্ঞের মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারের সরাসরি দাম নির্ধারণ সবসময় আদর্শ সমাধান না হলেও বাংলাদেশের ওষুধ বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কিছু কোম্পানির বাজার প্রভাব, অনিয়ম ও সিন্ডিকেশনের কারণে শুধু বাজারের প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করলে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষিত নাও হতে পারে। তাই দাম নির্ধারণে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি—তবে সেই দাম নির্ধারণের সময় কেবল উৎপাদন খরচ নয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে, যাতে রোগী ওষুধ কিনতে পারেন এবং কোম্পানিও টেকসইভাবে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দাম কম রাখার পাশাপাশি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দাম, মান, ভেজাল বা নকল ওষুধ প্রতিরোধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা—এই সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য ওষুধ প্রশাসনের তদারকি সক্ষমতা আরও বাড়ানো জরুরি বলে মত দিয়েছেন তারা। বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত হলে ফার্মেসি ও ওষুধ বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পরিদর্শন সহজ হবে এবং নকল বা নিম্নমানের ওষুধ দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব হবে। এতে রোগীরা যেমন মানসম্পন্ন ওষুধ পাবেন, তেমনি দেশীয় ওষুধ শিল্পও আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সরকার নিয়ন্ত্রণ করলে সরাসরি উপকৃত হন রোগীরা, বিশেষত যাদের দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ খেতে হয় এবং যেসব পরিবারের আয় সীমিত। দাম বাঁধা থাকলে চিকিৎসার মাসিক খরচের একটি পূর্বাভাস পাওয়া যায় এবং হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও কমে। তবে দাম এমনভাবে নির্ধারণ করা হলে যদি তা উৎপাদন খরচও মেটাতে না পারে, তাহলে কোম্পানিগুলোর উৎপাদনে আগ্রহ কমে যাওয়ার এবং বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। অন্যদিকে কোনো ধরনের মূল্য নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হলেও ওষুধের খরচের চাপ বাড়তে পারে রোগীর ওপর।
সব মিলিয়ে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও এর মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়—এটি সরাসরি জড়িত লাখো রোগীর চিকিৎসা ব্যয় ও জীবনমানের সঙ্গে। তাই আইনি জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর একটি নতুন তালিকা প্রণয়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

