শিল্পের অসুস্থতার চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর যাদের উৎপাদন খরচ আরও বেড়েছে, তাদের শুধু কিছুটা বেশি জ্বালানি দিলেই কি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে? নাকি শিল্পের ‘রোগ’ এতটাই গভীরে যে বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হবে কেবল সাময়িক স্বস্তি?
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা গেলে বড় ধরনের চাপ কমতে পারে; তবে সরবরাহের পরিমাণের পাশাপাশি দাম ও নির্ভরযোগ্যতা দুটিই ঠিক করতে হবে।
গ্যাসের সংকটেই আটকে আছে কারখানার চাকা
বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য প্রথমে গ্যাসের হিসাবটি দেখা দরকার। বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা আনুমানিক ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু জাতীয় গ্রিডে সাধারণত সরবরাহ থাকে প্রায় ২,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়েও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
আগস্টের সাম্প্রতিক সংকটে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে। ৬ আগস্ট একটি ইউনিট আংশিক চালু হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আবার গ্রিডে যোগ হয়েছে। এতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পূর্ণ সরবরাহ এখনো ফেরেনি।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কারখানায়। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল, নারায়ণগঞ্জ, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় কম গ্যাসচাপে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারছে না। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে শিল্প উদ্যোক্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, কিছু কারখানা আগে যেখানে প্রায় ৭৮ শতাংশ সক্ষমতায় চলছিল, সংকটের পর সেগুলোর কোনো কোনোটি প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় নেমে এসেছে। একই সময়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির হারও আগের বছরের ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমেছে।
গ্যাস না থাকলে শুধু উৎপাদন কমে না, খরচও বাড়ে
গ্যাসের সমস্যা শুধু ‘গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না’ এতটুকু নয়। গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক কারখানাকে বিকল্প জ্বালানির দিকে যেতে হয়। বিশেষ করে যেসব শিল্পে বয়লার, চুল্লি, ডাইং ইউনিট বা অন্যান্য তাপভিত্তিক যন্ত্রপাতি রয়েছে, সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তার একটি বাস্তব উদাহরণ। সেখানে গ্যাসের চাপ ১০ পিএসআই থেকে প্রায় ৩ পিএসআইয়ে নেমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে শিল্পসংশ্লিষ্টরা। ফলে বয়লার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠানকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তার সামনে তখন দুটি সমস্যা একসঙ্গে আসে উৎপাদন কমে যায়, কিন্তু স্থায়ী খরচ কমে না। শ্রমিকের বেতন, ঋণের কিস্তি, কারখানার ভাড়া, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় চলতেই থাকে। ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গুরুতর, কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে দাম বাড়ানো সব সময় সম্ভব নয়।
কিন্তু গ্যাসের দামও তো কম নয়
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। শুধু গ্যাসের সরবরাহ বাড়ালেই হবে না; গ্যাসের দামও শিল্পের প্রতিযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বাড়ানো হয়। নতুন শিল্পে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয় ৪০ টাকা, আর ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৪২ টাকা।
অর্থাৎ শিল্প উদ্যোক্তা যদি একদিকে পর্যাপ্ত গ্যাস না পান, অন্যদিকে যে গ্যাস পান তার দামও যদি বেশি হয়, তাহলে কেবল সরবরাহ স্বাভাবিক করলেই উৎপাদন খরচ আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। বরং শিল্পের জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য এবং পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, যাতে উদ্যোক্তা আগে থেকেই হিসাব করতে পারেন এক মাস পরে তাঁর উৎপাদন খরচ কত হতে পারে।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও চাপটা একই
গ্যাসের সংকট আবার বিদ্যুৎ খাতকেও আঘাত করছে। কারণ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বড় ভূমিকা রয়েছে। সাম্প্রতিক সংকটে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সংকটে পড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে ব্যবহার কমানোর ব্যবস্থাও নিতে হচ্ছে। ১৩ আগস্টের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার খবর এসেছে।
এখানে শিল্পের জন্য সমস্যা দ্বিগুণ। কারখানা যদি গ্যাস না পায়, উৎপাদন কমে। আবার বিদ্যুৎ না থাকলে একই কারখানার মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। জেনারেটর চালালে ডিজেল বা অন্য জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ শিল্পের জন্য শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি সরাসরি উৎপাদন খরচের সমস্যা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের দামও। ২০২৬ সালের জুনে বিদ্যুতের খুচরা দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। শিল্প গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও নতুন হার কার্যকর হয়েছে; মাঝারি ভোল্টেজের শিল্পগ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১২ দশমিক ৫২ থেকে ১৬ দশমিক ৩৬ টাকা এবং উচ্চ ভোল্টেজের গ্রাহকদের জন্য ১২ দশমিক ১২ থেকে ১৫ দশমিক ৯১ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
তাহলে বিদ্যুৎ-গ্যাস ঠিক হলে কী হবে?
এখানেই মূল প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা যায়। যদি শিল্পকে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত গ্যাস দেওয়া যায় এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করা যায়, তাহলে প্রথম পরিবর্তনটি আসবে উৎপাদন সক্ষমতায়। যে কারখানা বর্তমানে ৫০-৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে, সেটি তার বিদ্যমান যন্ত্রপাতি দিয়েই আরও বেশি উৎপাদন করতে পারবে। এর অর্থ হলো নতুন কারখানা না বানিয়েও বিদ্যমান বিনিয়োগ থেকে বেশি উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।
এই সম্ভাবনাটি কেবল তাত্ত্বিক নয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২৩ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের হিসাবে, গ্যাসের সংযোগ ও সরবরাহের অভাবে বাংলাদেশে অন্তত ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগ পড়ে আছে। অর্থাৎ উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করেছেন, কারখানা তৈরি করেছেন, কিন্তু জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদনে যেতে পারছেন না।
এ ধরনের বিনিয়োগ দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারলে অর্থনীতিতে একসঙ্গে কয়েকটি প্রভাব তৈরি হতে পারে কারখানার সক্ষমতা বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কাঁচামালের ব্যবহার বাড়বে, সরবরাহ বাড়বে এবং রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করার সুযোগ পাবে। গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশে এর আগে দেখা গেছে।
বিদ্যুৎ-গ্যাস ঠিক করলেই কি বিনিয়োগের দরজা খুলবে?
এখানে একটু সাবধান হওয়া দরকার। শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ-গ্যাসের নির্ভরযোগ্যতা প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু একমাত্র শর্ত নয়।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও দেখা গেছে, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকল্প জ্বালানিতে যেতে হয়, জ্বালানিনির্ভর যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ কমাতে হয় অথবা ডিজেল জেনারেটরের মতো ব্যয়বহুল বিকল্পে যেতে হয়। এতে উৎপাদনশীলতা কমে এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্তও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। একজন উদ্যোক্তা যদি জানেন যে কারখানায় গ্যাসের চাপ প্রতিদিন পরিবর্তিত হয়, বিদ্যুৎ কখন যাবে তা আগে থেকে জানা যায় না এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়, তাহলে নতুন মেশিন কেনা বা নতুন কারখানা করার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়াই স্বাভাবিক। তাই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট কমানো মানে শুধু বর্তমান কারখানাকে সাহায্য করা নয়; ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ঝুঁকিও কমানো।
আসল চিকিৎসা শুধু ‘বেশি গ্যাস’ নয়
তাই ‘হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মতো বিদ্যুৎ-গ্যাস দিয়ে শিল্পের স্বাস্থ্য ফিরবে কি না’ এই প্রশ্নের সবচেয়ে যুক্তিসংগত উত্তর হলো, বিদ্যুৎ-গ্যাস শিল্পের জন্য ওষুধ নয়, বরং অক্সিজেনের মতো। অক্সিজেন সরবরাহ না থাকলে রোগী সুস্থ হতে পারে না, কিন্তু শুধু অক্সিজেন দিলেই সব রোগ সেরে যায় না। তাই হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মতো নিয়ম করে ফোঁটায় ফোঁটায় বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ করে শিল্পকারখানার স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। শিল্পের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত জ্বালানি ছাড়া উৎপাদন স্বাভাবিক করা কঠিন; আবার জ্বালানি পেলেই বাজারের দুর্বল চাহিদা, উচ্চ সুদ, ঋণের চাপ, করব্যবস্থা, বন্দর ও পরিবহন ব্যয় কিংবা দক্ষতার সমস্যাগুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে না।
তবে বর্তমান তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো বাংলাদেশের শিল্প খাতে বিদ্যুৎ-গ্যাস এখন আর শুধু অবকাঠামোগত সুবিধা নয়, প্রতিযোগিতার মৌলিক শর্ত। গ্যাসের সরবরাহ জাতীয় চাহিদার তুলনায় অনেক কম, সংকটে শিল্পের সক্ষমতা কমছে, বিকল্প জ্বালানি খরচ বাড়াচ্ছে, বিদ্যুতের দামও বেড়েছে এবং বিপুল অঙ্কের শিল্প বিনিয়োগ জ্বালানি সংযোগের অভাবে আটকে আছে।
সুতরাং সরকার যদি সত্যিই শিল্পের ‘স্বাস্থ্য’ ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে শুধু গ্যাসের পরিমাণ বাড়ানো বা বিদ্যুতের সরবরাহ সাময়িকভাবে ঠিক করা যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, যুক্তিসংগত মূল্য, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা এবং শিল্প উদ্যোক্তার জন্য পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা। কারণ একটি কারখানা কখন উৎপাদন করবে, কত খরচে উৎপাদন করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কত দামে পণ্য বিক্রি করতে পারবে এই তিনটি হিসাবের কেন্দ্রে এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসই বসে আছে।
এই দিক থেকে দেখলে, প্রশ্নটি আসলে ‘বিদ্যুৎ-গ্যাস দিলে শিল্প সুস্থ হবে কি না’ নয়। প্রশ্ন হলো যে শিল্পগুলো জ্বালানির অভাবে তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারছে না, তাদের কাছে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি পৌঁছালে বাংলাদেশের অর্থনীতির কতটা অব্যবহৃত সক্ষমতা আবার কাজে ফিরতে পারে? বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বলছে, সম্ভাবনাটি ছোট নয়। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সরবরাহের পাশাপাশি জ্বালানির দাম ও নির্ভরযোগ্যতার সমস্যাও একসঙ্গে সমাধান করতে হবে।

