দেশের চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর আবারও জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে সামিট এলএনজি টার্মিনাল। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে টার্মিনালটি প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু করে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, ধাপে ধাপে সরবরাহ বাড়ার ফলে আগামী দিনে গ্যাসের ঘাটতি কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সামিট এলএনজি শুক্রবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১৫ আগস্ট রাত ২টার দিকে টার্মিনালটির সক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
গ্যাস সংকটে কেন এই সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ
দেশের শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহে ঘাটতি থাকলে একদিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেলে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়ে। ফলে জাতীয় গ্রিডে নতুন করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস যুক্ত হওয়া অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সামিট এলএনজি বর্তমানে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হবে।
৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে গেলে কী পরিবর্তন আসতে পারে
টার্মিনালটির পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেলে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে শিল্পকারখানায় গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে এর সুফল কতটা দ্রুত সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প খাতে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে জাতীয় সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাহিদার ওপর। শুধু আমদানি করা গ্যাসের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, সেই গ্যাস সঠিকভাবে সঞ্চালন ও বিতরণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপদ সরবরাহে জোর
সামিট এলএনজি জানিয়েছে, টার্মিনাল ও জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার কারিগরি সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে সর্বোচ্চ পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছে।
এখানে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এলএনজি গ্রহণ, পুনর্গ্যাসীকরণ এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ—প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে ধাপে ধাপে সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিল্প ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে গ্যাসনির্ভর শিল্প খাতের। উৎপাদন স্বাভাবিক হলে কারখানাগুলোর সক্ষমতা বাড়বে, কর্মসংস্থান ধরে রাখা সহজ হবে এবং শিল্পের সামগ্রিক কার্যক্রমে গতি আসতে পারে।
একইভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়লে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ কিছুটা কমতে পারে। এর পরোক্ষ সুবিধা অন্যান্য শিল্প ও সেবা খাতেও পৌঁছাতে পারে।
সামিট এলএনজি বলছে, বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস সংকট মোকাবিলা ও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেট্রোবাংলা ও সরকারের সঙ্গে তারা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
সব মিলিয়ে, বন্ধ থাকা সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়া বর্তমান সংকটের সময়ে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ আগামী ১৫ আগস্ট রাত ২টার দিকে সর্বোচ্চ ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।

