আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেই একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ উন্নত হয়ে যায় না, রোগীর প্রতি চিকিৎসকের মানবিক আচরণেরও কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার ভাষায়, প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে সক্ষম হলেও রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে ভরসা দেওয়ার কাজটি একমাত্র মানবিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই সম্ভব। আজ শনিবার রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে পাঁচশ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য শুধু অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয়, বরং প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, সুশাসন ও যুগোপযোগী নীতির সমন্বয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। নতুন এই ভবন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে আরও এক ধাপ এগোনো গেছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ২০০৬ সালের অক্টোবরে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাতে। প্রায় দুই দশক পর সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজ আরও বড় পরিসরে রূপ নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্ট্রোক, মৃগীরোগ, পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া কিংবা মেরুদণ্ডের জটিল রোগের মতো স্নায়ুবিক সমস্যা বর্তমানে বিশ্বজুড়েই একটি বড় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, আর দেশেও এ ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। নতুন এই পাঁচশ শয্যার ভবন চালুর মাধ্যমে এই ধরনের রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। আধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা ও বিশেষায়িত ওয়ার্ডের সমন্বয়ে গড়া এই ভবন কেবল রোগী ভর্তির সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
চিকিৎসা পরিবেশ নির্বিঘ্ন করার দায়িত্ব একা চিকিৎসকদের নয় বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসক, রোগী এবং রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন—এই তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতির সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। তার ভাষায়, চিকিৎসকরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, কিংবা রোগী ও তার স্বজনরা যদি চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ অনুভব না করেন, তাহলে হাসপাতালের অবকাঠামোগত যত উন্নয়নই করা হোক না কেন, চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশমুখী প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে না।
স্বাস্থ্যের অধিকারকে শুধু একটি মৌলিক অধিকার নয়, বরং একটি জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির চাবিকাঠি হিসেবে বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উন্নত চিকিৎসা যদি কেবল শহরকেন্দ্রিক বিত্তবান মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটিকে প্রকৃত অর্থে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বলা যায় না। এ কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চল, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রোগীকে যাতে বিপুল অর্থ খরচ করে রাজধানীতে ছুটে আসতে না হয়, সেই লক্ষ্যে সরকার ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে একটি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে, পাশাপাশি বর্তমান মেয়াদেই ধাপে ধাপে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সবশেষে তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে সরকার প্রমাণ করেছে যে ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিছক স্লোগান নয়, বরং একটি বাস্তব প্রতিশ্রুতি। তবে সরকার যত উদ্যোগই নিক না কেন, স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষকসহ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত সবার আন্তরিক ভূমিকার ওপর।

