দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট আবারও উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গতকাল বেলা ১১টা থেকে ইউনিটটি বন্ধ রয়েছে। ফলে কেন্দ্রটির তিনটি ইউনিটের মধ্যে এখন সচল আছে মাত্র তৃতীয় ইউনিট। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এমন এক সময়ে এই অচলাবস্থা তৈরি হলো, যখন জাতীয় গ্রিডে চাহিদা সামলাতে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন্দ্রটির প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, প্রথম ইউনিটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর সেটি বন্ধ করে মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। তবে ইউনিটটি কখন আবার উৎপাদনে ফিরবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি। এর আগে গত ৩১ জুলাইও একই ইউনিট যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। মেরামতের পর মাত্র দুই দিনের মাথায়, ২ আগস্ট ইউনিটটি আবার চালু করা হয়েছিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে ফের বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট তিনটি ইউনিটের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটটি বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২০২০ সাল থেকেই বন্ধ। ফলে কাগজে-কলমে ৫২৫ মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। প্রথম ইউনিট সচল থাকার সময়ও সেটি থেকে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট এবং তৃতীয় ইউনিট থেকে প্রায় ১৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছিল। প্রথম ইউনিট বন্ধ হওয়ায় কেন্দ্রটির দৈনিক সরবরাহ এখন মূলত তৃতীয় ইউনিটের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে।
বড়পুকুরিয়ার পরিস্থিতি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি পুরোনো সমস্যাকেও সামনে নিয়ে আসে, উৎপাদন সক্ষমতা থাকা আর সেই সক্ষমতা বাস্তবে কাজে লাগানো এক বিষয় নয়। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ হলে শুধু ওই কেন্দ্রের উৎপাদন কমে না; জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য রক্ষায়ও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে কোনো কেন্দ্রের একাধিক ইউনিট দীর্ঘদিন অচল থাকলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা কমে যায়। তখন অন্য কেন্দ্র থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন অথবা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে, যার সঙ্গে বাড়তি খরচও যুক্ত থাকে।
বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার বিষয়টিও তাই আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি ইউনিট বছরের পর বছর উৎপাদনের বাইরে থাকলে কেন্দ্রটির মূলধনী সক্ষমতার একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকে। অন্যদিকে সচল ইউনিটে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে অবশিষ্ট উৎপাদন সক্ষমতার ওপরও চাপ বাড়ে। এবার প্রথম ইউনিট মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পুনরায় বন্ধ হওয়ায় মেরামতের মান, যন্ত্রপাতির অবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। কেন্দ্রটি স্থানীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এর উৎপাদন কমে গেলে উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে। যদিও জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হলে অন্যান্য কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়ে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য শুধু নতুন কেন্দ্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়; বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রথম ইউনিটটি কত দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারে। এর আগে ৩১ জুলাই থেকে ২ আগস্টের মধ্যে মেরামত করে ইউনিটটি চালু করা হলেও আবারও ত্রুটি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ২০২০ সাল থেকে দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ থাকায় কেন্দ্রটির ৫২৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার বড় অংশ কার্যত ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তৃতীয় ইউনিটটি সচল থাকলেও সেটি একা কেন্দ্রটির স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। ফলে বড়পুকুরিয়ার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক মেরামতের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অচল ইউনিট পুনরায় চালু করা এবং পুরো কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

