২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ কাগজে-কলমে এক বছরে লক্ষ্য বাড়ছে ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। সংখ্যাটি বড়, কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন: কৃষির বাস্তব চাহিদা কি এক বছরে এতটাই বেড়েছে, নাকি ব্যাংকগুলোকে কৃষিখাতে আরও বেশি ঋণ দিতে বাধ্য করার নীতি কাজ করছে?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ৩৯ হাজার কোটি টাকা ছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা, আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ওই অর্থবছরে কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। অর্থাৎ নতুন ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যটি শুধু আগের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি নয়, গত অর্থবছরের বাস্তব বিতরণের তুলনাতেও প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ফলে এটি নিছক আগের ধারার ওপর সামান্য সমন্বয় নয়; বরং কৃষিতে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর একটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত।
এত বড় লাফের কারণ কোথায়?
গত কয়েক বছরে কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা অবশ্যই বেড়েছে, কিন্তু বৃদ্ধির গতি ছিল তুলনামূলকভাবে ধীর। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকগুলো বাস্তবে ৩৭ হাজার ১৫৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা বিতরণ করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্য বাড়িয়ে ৩৮ হাজার কোটি করা হয় এবং বাস্তব বিতরণ হয় ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্য হয় ৩৯ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ তিন বছরে লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ হাজার কোটি থেকে ৩৯ হাজার কোটি টাকায় উঠেছিল বৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ। সেখানে এবার এক লাফে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই পার্থক্যটিই বিশ্লেষণের জায়গা তৈরি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি অবশ্য শুধু কৃষকের হাতে টাকা পৌঁছানো নয়। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো এসবই কৃষিঋণ নীতির উদ্দেশ্য। ২০২৫-২৬ সালের নীতিতেও কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, যান্ত্রিকীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ঋণপ্রাপ্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায় ঋণের লক্ষ্য বাড়লেই কি কৃষির উৎপাদন বা কৃষকের আয় একই হারে বাড়ে? উত্তরটি এত সরল নয়।
কৃষির ঋণের প্রয়োজন কি সত্যিই ৬০ হাজার কোটি?
কৃষিতে অর্থের প্রয়োজন যে বাড়ছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সার, বীজ, সেচ, শ্রম, কৃষিযন্ত্র, জমি প্রস্তুত, গবাদিপশু, মৎস্যচাষ সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার বন্যা, খরা, নদীভাঙন ও অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকিও কৃষকের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব গবেষণাতেও এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। আট বিভাগ ও ৪১ জেলার ১,০৩৪ জন কৃষিঋণগ্রহীতা এবং ১৬১টি ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপকদের ওপর করা জরিপে প্রায় ২৫ শতাংশ ঋণগ্রহীতা জানিয়েছেন, তাদের বর্তমান ঋণের সীমা উৎপাদন খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে মৎস্য, কলা চাষ ও নতুন ধরনের কৃষি উদ্যোগে অর্থের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।
অর্থাৎ কৃষিতে ঋণের চাহিদা আছে। কিন্তু এখানেই আরেকটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ ঋণের প্রয়োজন আর ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন এক বিষয় নয়। একজন কৃষকের ২ লাখ টাকা দরকার হতে পারে, অন্যজনের ২০ লাখ। আবার কারও জন্য ঋণের চেয়ে ফসলের ন্যায্য দাম, সেচ, সংরক্ষণাগার বা বাজারসংযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তাই শুধু ‘কত টাকা ঋণ দেওয়া হলো’ দিয়ে কৃষির অর্থায়ন সফল হয়েছে কি না মাপলে ছবির অর্ধেকই দেখা হবে।
আসল কৃষক কতটা পাচ্ছেন?
এই জায়গাটিই সম্ভবত নতুন লক্ষ্যমাত্রার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, ঋণগ্রহীতাদের ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ নিজেই ঋণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন এবং মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল, আত্মীয় বা অন্য কারও মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। অর্থাৎ মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি পুরো ব্যবস্থাজুড়ে ব্যাপক এমন সিদ্ধান্ত গবেষণার তথ্য থেকে সরাসরি টানা যায় না। কিন্তু ঋণের ব্যবহার নিয়ে আরও বড় একটি প্রশ্ন আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, কৃষিঋণগ্রহীতাদের ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ ঘোষিত কৃষিকাজের বাইরে ঋণের অর্থ ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে অন্য খাতে বেশি লাভের সম্ভাবনা, কৃষিঋণের তুলনামূলক কম সুদ এবং জরুরি খরচ ছিল উল্লেখযোগ্য কারণ। অর্থাৎ কৃষকের নামে বিতরণ করা ঋণের পুরো অর্থ সবসময় কৃষি উৎপাদনেই যাচ্ছে না।
এখানেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার গুরুত্ব। গভর্নর ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত কৃষকের কাছে ঋণের অর্থ পৌঁছানো এবং বিতরণে অনিয়ম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাগজে একজন কৃষক আর মাঠে একজন প্রকৃত কৃষকের মধ্যে পার্থক্য ব্যাংক কীভাবে করবে?
কারণ কৃষিঋণ শুধু ব্যাংকের শাখায় বসে যাচাই করা যায় না। কৃষকের জমি আছে কি না, তিনি আসলে কোন ফসল করেন, উৎপাদনের পরিমাণ কত, আগের ঋণের টাকা কোথায় গেছে এসব যাচাই করতে মাঠপর্যায়ের তথ্য দরকার। নতুন ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য পূরণের চাপে যদি শুধু ঋণ বিতরণের সংখ্যা বাড়ানো হয়, তাহলে প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে ‘লক্ষ্যমাত্রা পূরণ’ নিজেই ব্যাংকের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
কে কত টাকা দেবে?
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য ৩ হাজার ৬৫৭ কোটি, রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকের জন্য ১০ হাজার ২২৩ কোটি, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য ২৩ হাজার ৫২৭ কোটি এবং বিদেশি ব্যাংকের জন্য ১ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা নির্ধারিত ছিল।
নতুন ৬০ হাজার কোটি টাকার কাঠামোয় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য মোট ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি এবং বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কৃষিঋণ বিতরণের দায়িত্ব আরও বড় হচ্ছে।
এটি নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতদিন কৃষিঋণের সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বিশেষায়িত ব্যাংকের সম্পর্ক ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫-২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই সব ব্যাংক মিলে ২১ হাজার ৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছিল, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ দশমিক ২১ শতাংশ বেশি।
তবে এই পরিবর্তনের আরেকটি দিকও আছে। বেসরকারি ব্যাংককে গ্রামে গিয়ে ছোট কৃষকের কাছে ঋণ দিতে হলে তাদের শাখা, এজেন্ট নেটওয়ার্ক, মাঠপর্যায়ের যাচাই এবং ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্য দিলেই সেই সক্ষমতা তৈরি হয় না।
কৃষকের আয় বাড়ছে, নাকি শুধু ঋণের অঙ্ক?
এই প্রশ্নটি সবচেয়ে কঠিন। কারণ কৃষকের জন্য ঋণ তখনই অর্থবহ, যখন ঋণ নিয়ে উৎপাদন করে তিনি খরচ বাদ দিয়ে লাভ করতে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের জরিপে ৮৯ দশমিক ৯ শতাংশ ঋণগ্রহীতা জানিয়েছেন, ঋণ নেওয়ার পর তাদের উৎপাদন কার্যক্রম লাভজনক হয়েছে এবং ৮৭ দশমিক ৯ শতাংশ বলেছেন, সেই লাভ থেকেই ঋণ পরিশোধ করতে পেরেছেন। একই জরিপে ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণগ্রহীতা তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতির কথা জানিয়েছেন। এগুলো আশাব্যঞ্জক তথ্য। কিন্তু একই গবেষণায় ঋণের পরিমাণ বাড়ানো, সুদ পুনর্বিবেচনা, দুর্যোগের সময় নমনীয় পরিশোধব্যবস্থা এবং ঋণের ব্যবহার আরও শক্তভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে।
সুদের প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৫-এ কৃষিঋণের গড় সুদের হার ছিল ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা জুন ২০২৪-এর ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশের চেয়ে বেশি। তবে ২০২৬ সালের জুনে চালু করা নতুন ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষি ও প্রাণিসম্পদ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশে অর্থ দিয়ে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য ফসল বন্ধক রেখে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ সব কৃষিঋণের সুদ এক নয়। কিন্তু কৃষকের কাছে আসল হিসাব আরও সহজ—এক বিঘা জমিতে মোট খরচ কত, ঋণের সুদ কত, ফসল বিক্রি করে কত পাওয়া যাচ্ছে এবং সবকিছু বাদ দিয়ে হাতে কত থাকছে?
ঋণ বাড়লেই খাদ্যের দাম কমবে?
নীতিগতভাবে কৃষিতে বেশি অর্থ গেলে উৎপাদন বাড়তে পারে। উৎপাদন বাড়লে বাজারে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা খাদ্যের দামের ওপর চাপ কমাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই সম্পর্ক সরাসরি নয়।
একজন কৃষক ঋণ নিয়ে ধান উৎপাদন করলেন। উৎপাদন বাড়ল, কিন্তু harvest-এর সময় বাজারে দাম পড়ে গেল তাহলে কৃষকের আয় বাড়ল না। আবার উৎপাদনের খরচ যদি দ্রুত বাড়ে, ঋণ পেলেও লাভ কমে যেতে পারে। একইভাবে আলু, পেঁয়াজ বা সবজির ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধা না থাকলে কৃষককে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হতে পারে।
এ কারণেই কৃষিঋণকে শুধু ‘টাকা দেওয়া’ হিসেবে দেখলে হবে না। ঋণের সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, সংরক্ষণ, বাজারব্যবস্থা, কৃষিপণ্যের মূল্য, আমদানি নীতি এবং সরবরাহব্যবস্থাকে একসঙ্গে দেখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব গবেষণাও কৃষকের সুরক্ষায় মূল্যস্থিতিশীলতার ব্যবস্থা, ফসল সংগ্রহ ও বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দুর্যোগের সময় নমনীয় ঋণপরিশোধের মতো পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণই যেন সাফল্যের মাপকাঠি না হয়
এখানে এসে ৬০ হাজার কোটি টাকার সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক কি ৬০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করতে চাইছে, নাকি ৬০ হাজার কোটি টাকা এমন কৃষকের কাছে পৌঁছাতে চাইছে, যার সত্যিই উৎপাদনের জন্য সেই টাকা প্রয়োজন?
দুটি বিষয় এক নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিপে যেমন দেখা গেছে, ১২ দশমিক ১ শতাংশ ঋণগ্রহীতা অনুমোদিত ঋণের চেয়ে কম অর্থ পেয়েছেন। আবার ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণগ্রহীতা ঋণের অর্থ ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ শুধু অনুমোদন এবং বিতরণের হিসাব দিয়ে ঋণের প্রকৃত প্রভাব বোঝা যায় না।
আরেকটি বিষয়ও চোখে পড়ার মতো। কৃষিঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি খেলাপি ও অতিরিক্ত বকেয়া ঋণের চাপও বেড়েছে। ২০২৬ সালের মে শেষে কৃষিখাতে শ্রেণিকৃত ঋণ ২০ হাজার ১৩০ কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে; এটি মোট কৃষিঋণের বড় একটি অংশ। এর পেছনে ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর হওয়াও একটি কারণ, তাই পুরো বৃদ্ধিকে কৃষকের ঋণ পরিশোধে অক্ষমতার সরল প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবু এত বড় অঙ্কের নতুন ঋণ দেওয়ার আগে পুনরুদ্ধার ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
শেষ পর্যন্ত ৬০ হাজার কোটি টাকার এই লক্ষ্যমাত্রার সাফল্য নির্ভর করবে একটি খুব সাধারণ প্রশ্নের উত্তরের ওপর কত টাকা বিতরণ হলো নয়, সেই টাকা দিয়ে কতজন কৃষক উৎপাদন বাড়াতে পারলেন এবং উৎপাদনের পর সত্যিই আয় করতে পারলেন?
কারণ ব্যাংকের খাতায় কৃষিঋণ ৬০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। কিন্তু কৃষকের খাতায় যদি ঋণের কিস্তি, সুদ আর উৎপাদন খরচের পরও লাভ না থাকে, তাহলে বড় লক্ষ্যমাত্রা বড় সাফল্য নয়। আর যদি প্রকৃত কৃষক, বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক কৃষক, সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থ পান, সেই অর্থ উৎপাদনে ব্যবহার করেন এবং ন্যায্য দামে ফসল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে পারেন তবেই ৬০ হাজার কোটি টাকার এই লাফকে কৃষি অর্থনীতির বাস্তব পরিবর্তন বলা যাবে।

