বাংলাদেশে গমের চাহিদা শক্তিশালী থাকলেও আগামী বিপণন বছরে আমদানি কমতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে উচ্চ দাম, দেশে পর্যাপ্ত মজুত এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গম আমদানি প্রায় ১১ শতাংশ কমে ৬৬ লাখ টনে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (USDA)।
বাংলাদেশে গমভিত্তিক খাদ্যের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। গত বিপণন বছরে দেশে প্রায় ৭৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছিল। গমের বিপণন বছর সাধারণত জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত হিসাব করা হয়।
রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে গমের রপ্তানি সরবরাহ কিছুটা সীমিত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের সরবরাহ ও বাণিজ্য প্রবাহ আগের তুলনায় আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
জুলাইয়ের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গমের রপ্তানি মূল্য প্রতি টনে প্রায় ২৬ ডলার বেড়েছে। আগস্টে হার্ড রেড উইন্টার বা HRW গমের দাম প্রতি টন ৩২১ ডলারে পৌঁছায়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৯ হাজার ৫০০ টাকারও বেশি।
বাংলাদেশের গম আমদানির বাজার দাম-সংবেদনশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি আমদানির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। দাম বেশি থাকলে ব্যবসায়ীরা নতুন করে বড় পরিমাণে গম আমদানিতে তুলনামূলকভাবে সতর্ক থাকতে পারেন।
গত বছর বেসরকারি খাত রেকর্ড পরিমাণ গম আমদানি করেছিল। এর ফলে দেশের মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের হাতে এখন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গমের মজুত রয়েছে।
ইউএসডিএর মতে, এই মজুত চলতি বছরে নতুন আমদানির প্রয়োজন কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে।
গত বছর বেসরকারি খাতের গম আমদানি প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়ে ৬৬ লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছায়। একই সময়ে সরকারি খাতের আমদানি ৬১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ৫১ হাজার টনে দাঁড়ায়।
সরকারি আমদানির বড় একটি অংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশ প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার টন মার্কিন গম সংগ্রহ করে।
এ ছাড়া ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৭ লাখ টন মার্কিন গম কেনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে সরকারের। চলতি বছরের জন্য ইতোমধ্যে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টন গম কেনার চুক্তিও করা হয়েছে।
গম আমদানি কমার সম্ভাবনা থাকলেও দেশের মোট গম ব্যবহার বাড়বে বলে ধারণা করছে ইউএসডিএ। সংস্থাটি চলতি বছরে প্রায় ৭৮ লাখ টন গম ব্যবহারের পূর্বাভাস দিয়েছে, যা আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি।
দেশে আটা ও ময়দার চাহিদা এখনও শক্তিশালী। শুধু পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্যেই নয়, বিস্কুট, কনফেকশনারি, পাস্তা, নুডলস এবং বেকারি শিল্পেও গমের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘ সময় ধরে চালের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে আগের চেয়ে বেশি আটা ও গমজাত খাবার ব্যবহার করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশে গমের চাহিদা বাড়লেও স্থানীয় উৎপাদন খুব বেশি বাড়ছে না। ইউএসডিএ বাংলাদেশের গম উৎপাদনের পূর্বাভাস ১০ লাখ ৫০ হাজার টনে অপরিবর্তিত রেখেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গমের আবাদি জমি ও উৎপাদন প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। কৃষকদের মধ্যে গম চাষ সম্প্রসারণের আগ্রহও তুলনামূলকভাবে কম।
এর অন্যতম কারণ, একই রবি মৌসুমে ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি চাষ করে অনেক কৃষক বেশি লাভ করতে পারেন। ফলে গম চাষে অতিরিক্ত জমি ব্যবহারের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
এ ছাড়া দেশের আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই উচ্চফলনশীল গমের জাতের সীমিত প্রাপ্যতাকেও উৎপাদন বৃদ্ধির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দেশে গমের ব্যবহার বাড়লেও বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, বিদ্যমান মজুত এবং স্থানীয় উৎপাদনের স্থবিরতার কারণে আগামী বছরে গমের বাজারে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা যেতে পারে।

