রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণে বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ওষুধ কেনা, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, ওষুধ ছিটানো থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা—সব মিলিয়ে গত তিন দশকে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এত অর্থ খরচের পরও মশার উপদ্রব কমেনি, থামেনি ডেঙ্গুর প্রকোপও।
চলতি বছর সারা দেশে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ জনই ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। কীটতত্ত্ববিদেরা আশঙ্কা করছেন, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বরজুড়ে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মশা নিয়ন্ত্রণে মূলত কীটনাশক ও ওষুধের ওপর নির্ভর করাই সমস্যার অন্যতম কারণ। একই ধরনের কীটনাশক বছরের পর বছর ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে ওষুধপ্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। তাই শুধু ওষুধ ছিটিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তাঁর মতে, আলাদা একটি দক্ষ ইউনিট গঠন করে সেখানে পরিকল্পনাবিদ ও জীববিজ্ঞানীদের যুক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।
চার বছরেই ব্যয় প্রায় ৫৫০ কোটি
সাম্প্রতিক চার অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যয় ৩৮৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই সংস্থাটি মশা নিয়ন্ত্রণে ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ওষুধ কেনায় ৮০ কোটি টাকা এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে মশক নিয়ন্ত্রণে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব রয়েছে।
আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যয় ছিল ১৩১ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে যথাক্রমে ৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও ৫০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির ব্যয় ছিল ৩৩ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ২২ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
তবে দীর্ঘ সময়ের হিসাব আরও বড়। ১৯৯৬-৯৭ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ২৭ বছরে মশার ওষুধ, ধোঁয়া দেওয়া, পরিবহন ও যন্ত্রপাতি কেনাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়েছে ৭৬৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। একই সময়ে মশক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হয়েছে ৫০৬ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজার টাকা। দুই খাত মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা।
মাছ, হাঁস, ব্যাঙ থেকে ড্রোন—কত উদ্যোগ!
মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। কোথাও ড্রেন-নর্দমায় মাছ ও ব্যাঙ ছাড়া হয়েছে, কোথাও জলাশয়ে হাঁস নামানো হয়েছে। এমনকি মশার প্রজননস্থল খুঁজতে ড্রোনও ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২২ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র কদমগাছ ও ফিঙে পাখির মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণের ধারণার কথাও জানিয়েছিলেন। এর আগে মশার লার্ভা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ঝিল, লেক ও পুকুরে কয়েক হাজার হাঁস ও ব্যাঙ ছাড়া হয়েছিল।
একই বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ড্রোন ব্যবহার করে বিভিন্ন ভবনের ছাদে এডিস মশার লার্ভা খোঁজার উদ্যোগ নেয়।
তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন কীটতত্ত্ববিদেরা। তাঁদের মতে, মাছ, হাঁস, ব্যাঙ বা পাখির ওপর নির্ভর করে মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।
কীটতত্ত্ববিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী এসব উদ্যোগকে অবৈজ্ঞানিক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ওষুধের পাশাপাশি আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
সামনে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারের মতে, আগস্টের শেষ দিকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং সেপ্টেম্বরেও সেই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। বৃষ্টির কারণে এডিস মশার যে প্রজনন হয়েছে, সেগুলো এখন রোগ ছড়ানোর উপযোগী হয়ে উঠছে।
তাই মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়েও সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে বাড়ির আশপাশে কোথাও যেন পানি জমে এডিস মশার বংশবিস্তার না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
এবার জোর দেওয়া হচ্ছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায়
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কায় দুই সিটি করপোরেশন নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, কোনো এলাকা থেকে মশার অভিযোগ পাওয়া গেলে সেখানে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন গুণ কর্মী নিয়ে পুরো ওয়ার্ডে কাজ করা হচ্ছে। সকালে লার্ভা ধ্বংস এবং বিকেলে উড়ন্ত মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম চালানো হয়। এক সপ্তাহ ধরে এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও মশার উৎস শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর ঠিকানা সংগ্রহ করে দ্রুত সেখানে বিশেষ দল পাঠিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নির্মূল করা সম্ভব নয়। নগরীর পরিচ্ছন্নতা, বৃষ্টির পানি জমে থাকা এবং মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি জোরদার করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

