ধান উৎপাদনে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এখন বেশ ভালো অবস্থানে। কিন্তু বৈশ্বিক হিসাব সামনে রাখলে চিত্রটি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৫.৩ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। একই সময়ে ভারতে এই পরিমাণ প্রায় ৪.৩ টন, পাকিস্তানে ৩.৭৪ টন এবং নেপালে ৪.১৯ টন। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ধানের উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশই এগিয়ে।
তবে বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদনশীল দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান মাঝামাঝি। বিশ্বে প্রতি হেক্টরে গড় ধান উৎপাদন প্রায় ৪.৭ থেকে ৪.৮ টন। সেখানে চীনে উৎপাদন প্রায় ৭.১ টন, যুক্তরাষ্ট্রে ৮.৬৮ টন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১১.৯ টন। এমনকি মরুভূমিপ্রবণ দেশ মিসরেও প্রতি হেক্টরে ধানের ফলন প্রায় ৯.১ টন।
অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় ভালো অবস্থানে থাকলেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সামনে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে। আর এই ব্যবধান এখন কেবল কৃষির পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের আয়, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যতের পানি ও জমির নিরাপত্তার সঙ্গেও বিষয়টি সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৪ কোটি ১৯ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। তারপরও একই সময়ে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টন চাল আমদানি করতে হয়েছে, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর অর্থ হলো, বিপুল উৎপাদনের পরও দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা সব সময় চাহিদার ধাক্কা সামলাতে পারছে না।
আমদানির আর্থিক হিসাবটি আরও বড় উদ্বেগের। ২০২৪ অর্থবছরে চাল আমদানিতে যেখানে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ২ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ কোটি ২৪ লাখ ডলারে। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৫৮৪ শতাংশ। এর পেছনে বড় ভূমিকা ছিল বন্যায় দেশের ১০ লাখ টনের বেশি চাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার।
এদিকে দেশের ধান উৎপাদনব্যবস্থার আরেকটি বড় চাপ তৈরি করছে পানির ব্যবহার। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মতো খরাপ্রবণ এলাকায় পানিসম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
তাই বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্নটি শুধু ‘আরও বেশি ধান উৎপাদন করা যাবে কি না’—এমন নয়। বরং একই জমি ও সীমিত পানিসম্পদ ব্যবহার করে কীভাবে আরও বেশি ধান উৎপাদন করা যায়, সেটিই হয়ে উঠছে মূল চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে যদি মাটির উর্বরতা কমে যায় কিংবা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে, তাহলে বর্তমান উৎপাদনও দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
প্রযুক্তি আছে, সমস্যা পৌঁছানোয়
বাংলাদেশের ধান উৎপাদন কম হওয়ার পেছনে প্রযুক্তির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি দায়ী—এমনটা মনে করেন না কৃষি অর্থনীতিবিদরা। বরং বড় সমস্যা হলো, গবেষণাগারে তৈরি প্রযুক্তি ও নতুন জাত কৃষকের মাঠে প্রয়োজনীয় মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সায়লা খন্দকারের মতে, ধানের উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে বীজ, সার, শ্রম ও সেচের ব্যবহার, প্রযুক্তি গ্রহণ, মাটির গুণমান, জলবায়ু ঝুঁকি এবং কৃষকের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও কৃষি সম্প্রসারণসেবার সঙ্গে যোগাযোগের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে প্রায় ১২৭টি উচ্চফলনশীল আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাতের মধ্যে লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল এবং স্বল্পমেয়াদি জাতও রয়েছে। কিন্তু এসব জাতের কতগুলো বাস্তবে কৃষকের জমিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সায়লা খন্দকারের মতে, গবেষণা, কৃষি সম্প্রসারণ এবং কৃষকের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের ঘাটতি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পথে অন্যতম প্রধান বাধা। কৃষক অনেক সময় নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানেন না। আবার জানলেও সেটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞান না থাকায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না।
অথচ নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের সুফল যে যথেষ্ট বড় হতে পারে, তার প্রমাণও গবেষণায় রয়েছে। হাইব্রিড ধানের জাত ব্যবহারকারী কৃষকরা অন্য কৃষকদের তুলনায় ৬.২৪ শতাংশ বেশি কারিগরি দক্ষ ছিলেন। একই সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উৎপাদন প্রায় ১২.০৩ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ নতুন জাত বা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেই কাজ শেষ হচ্ছে না। সেটিকে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, ব্যবহার শেখানো এবং বাস্তবে লাভজনক করে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও বড় কারণ
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য-পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, দেশের ধানের উৎপাদনশীলতার সীমা তৈরি হওয়ার পেছনে প্রযুক্তির পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখছে।
চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উচ্চ উৎপাদনশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও পিছিয়ে। একই সঙ্গে কৃষকের জমি ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
কখন কতটুকু সার ব্যবহার করতে হবে, কী পরিমাণ পানি দিতে হবে কিংবা কোন পর্যায়ে জমিতে কী ধরনের ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন—এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বা কম উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, আবার মাটির গুণমানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত সার ও পানির ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে। কিন্তু মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে বা মাটির প্রকৃতি অনুযায়ী উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বদলাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সব ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ধান উৎপাদনের সম্ভাবনার ওপর একটি অদৃশ্য সীমা তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতি ও উন্নত ব্যবস্থাপনা ছাড়া সেই সীমা ভাঙা কঠিন।
বাংলাদেশ ধান গবেষণায় অবশ্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। দেশে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত জাতের সংখ্যা প্রায় ১২০টির মতো। পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান মিলেও প্রায় ১৫০টি জাত উদ্ভাবন করেছে।
তবে কৃষি গবেষণা এমন কোনো কাজ নয়, যা একবার সফল হলেই দীর্ঘদিন একইভাবে চলবে। জলবায়ু পরিবর্তন, পানির সংকট, নতুন রোগবালাই এবং বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে।
চীন, ভিয়েতনাম ও অন্যদের কাছ থেকে শিক্ষা
ধান উৎপাদনে চীনের অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। ১৯৭৮ সালের পর চীন ধান চাষের জমির পরিমাণ প্রায় ১৪ শতাংশ কমিয়েছে। অথচ একই সময়ে ধানের উৎপাদন ৪৪ শতাংশের বেশি বাড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের সরকারি সহায়তায় হাইব্রিড ধান গবেষণার মাধ্যমে তারা উৎপাদনের নতুন সীমা তৈরি করেছে। তাদের অতিউচ্চফলনশীল ধান কর্মসূচিতে প্রতি হেক্টরে প্রায় ১২ টন উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলক কিছু জাতের উৎপাদন ১৭ টনেরও বেশি হয়েছে।
ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন। মেকং বদ্বীপে পরিবেশগত চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটি ধান উৎপাদনে ব্যবস্থাপনার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জমিতে সব সময় পানি ধরে রাখার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময় পর পর পানি দেওয়া এবং জমি শুকানোর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের ১০ লাখ হেক্টর উচ্চমানের ধান কর্মসূচির লক্ষ্য হলো উৎপাদনের মান বাড়ানোর পাশাপাশি সার, পানি ও অন্যান্য উপকরণের ব্যবহার এবং পরিবেশগত ব্যয় কমানো।
যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া দেখিয়েছে আরেক ধরনের পথ। সেখানে কৃষি অনেক বেশি যন্ত্রনির্ভর। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে সার প্রয়োগ, সেচ এবং ফসল পর্যবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে কম শ্রম ও তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত উপকরণ ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এসব দেশের পথ হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নয়। তবে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—শুধু জমির পরিমাণ বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানোর দিন শেষ। একই জমিতে আরও বেশি উৎপাদনের জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকের দক্ষতাকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।
বড় পরিবর্তনের সুযোগ এখনও রয়েছে
বাংলাদেশের নিজস্ব গবেষণাতেও আশার জায়গা রয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশে ধানের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করা’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন লক্ষ্যে পৌঁছাতে জিনগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ৪১ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
এর অর্থ হলো, নতুন কোনো বৈপ্লবিক প্রযুক্তির জন্য অপেক্ষা না করেও বর্তমান কৃষি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
জমিতে সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ সার প্রয়োগ, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ, উন্নত বীজ ব্যবহার, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো চাষ ও ফসল কাটার মতো বিষয়গুলো উৎপাদন বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এসব প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা কৃষকের হাতে পৌঁছাতে হলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষকের মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান ও দলনেতা ওভেন ক্যালভার্টের মতে, বাংলাদেশের কৃষির পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জমি, শ্রম, পানি ও সারসহ সব সম্পদের দক্ষ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি ধান উৎপাদনে সারের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি যন্ত্রের মাধ্যমে চারা রোপণের ব্যবস্থা শ্রমিক সংকট মোকাবিলা, উৎপাদনের বাধা কমানো এবং সঠিক সময়ে ফসল প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য আসবে না। প্রযুক্তির সঙ্গে উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর কৃষিসেবা যুক্ত করতে হবে।
উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে পানির সংকট তৈরি করা যাবে না
বাংলাদেশের ধান উৎপাদন নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি হলো পানি। বোরো ধান উৎপাদনে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তাই শুধু চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্য সামনে রাখলে হবে না। উৎপাদনের খরচ কত, কত পানি লাগছে, মাটির ওপর কী প্রভাব পড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কতটা বাড়ছে—এসব বিষয়ও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
সায়লা খন্দকারের মতে, ধানের উৎপাদনশীলতা শুধু কৃষির বিষয় নয়; এটি সামষ্টিক অর্থনীতি ও জাতীয় স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত। ধানের উৎপাদন বাড়লে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা শক্তিশালী হয়, কৃষকের আয় বাড়ে, সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দামের ওঠানামার ওপর নির্ভরতা কমে।
তবে সেই উৎপাদন হতে হবে কম খরচে এবং কম জলবায়ু ঝুঁকিতে। অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত একই জমি থেকে বেশি ধান উৎপাদন করা, কিন্তু তার জন্য অতিরিক্ত পানি, সার বা অন্যান্য সম্পদের অপচয় না করা।
গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন
বাংলাদেশের ধান গবেষণার সাফল্য থাকলেও গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আধুনিক জাত উদ্ভাবন, অঞ্চলভেদে উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি এবং সেই প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে লবণাক্ততা, খরা, বন্যা ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের মতো ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু বেশি ফলন দেয় এমন জাত নয়, প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এমন জাতের প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে ধানের বাজারব্যবস্থা ও সরবরাহশৃঙ্খল উন্নত করাও জরুরি। উৎপাদন বাড়লেও কৃষক যদি ন্যায্য দাম না পান, তাহলে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের আগ্রহ কমে যেতে পারে। উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন ধান উৎপাদনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতার অবস্থান ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়। বৈশ্বিক পর্যায়ে ব্যবধান কমাতে হলে প্রযুক্তিকে মাঠে পৌঁছে দিতে হবে, কৃষকের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়াতে হবে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং পানি ও জমির ব্যবহার আরও কার্যকর করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের ধান উৎপাদনের পরবর্তী অগ্রগতি শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর করবে না। গবেষণাগারের জ্ঞান যখন কৃষকের মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হবে, তখনই উৎপাদনশীলতার বর্তমান সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হবে। একই জমি ও একই পানিসম্পদ থেকে আরও বেশি উৎপাদন—কিন্তু কম অপচয়, কম খরচ এবং কম পরিবেশগত ক্ষতির মাধ্যমে—এটাই এখন বাংলাদেশের ধান খাতের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত।

