বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর নতুন বাস্তবতা সামনে আসছে; অন্যদিকে দেশের লাখো তরুণের সামনে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন চাকরি কোথায়? রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, একজন শিক্ষিত বেকার তরুণের কাছে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত মাপা হয় একটি সহজ প্রশ্নে: তার জন্য কি সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ তৈরি হচ্ছে?
এখানেই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব।
রাজনীতি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে শিক্ষিত এবং সবচেয়ে প্রত্যাশাপূর্ণ অংশ তরুণ প্রজন্ম নিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায়। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ও দেশভিত্তিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে বারবার উঠে এসেছে চাকরি, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। কলেজশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হারও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ছি যেখানে রাজনৈতিক পদগুলো নিয়মিত পূরণ হবে, কিন্তু তরুণদের স্বপ্নের জায়গাগুলো ক্রমশ শূন্য হয়ে যাবে?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিঃসন্দেহে সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়া জরুরি। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কেবল ভবন, পদ কিংবা নির্বাচন দিয়ে শক্তিশালী হয় না। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন সে অনুভব করে তার শিক্ষা, শ্রম, মেধা ও স্বপ্নেরও রাষ্ট্রের কাছে মূল্য আছে।
আজকের তরুণ সেই মূল্য খুঁজছে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া, একের পর এক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া, অল্পসংখ্যক পদের বিপরীতে হাজারো আবেদনকারীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা—এটাই কি আমাদের উচ্চশিক্ষার চূড়ান্ত গন্তব্য? যদি একজন তরুণের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হয় দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া, তাহলে শুধু ব্রেইন ড্রেন নয়, এর অর্থ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার আস্থাও ক্ষয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এখন নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি শুধু প্রবৃদ্ধি চাই, নাকি কর্মসংস্থানসমৃদ্ধ প্রবৃদ্ধি চাই?
কারখানা বাড়লেই হবে না, যদি দক্ষ কর্মসংস্থান না বাড়ে। ডিজিটালাইজেশন হলেই হবে না, যদি তরুণদের নতুন প্রযুক্তির জন্য দক্ষ করে তোলা না যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না, যদি শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা না পায়। সাম্প্রতিক আলোচনাতেও বাংলাদেশের জন্য শুধু ডিজিটাল প্রবেশাধিকার নয়, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও এআই সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, আমাদের রাজনীতি এখনো অনেক সময় তরুণদের ভোটার হিসেবে দেখে, কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণে অর্থনৈতিক নাগরিক হিসেবে দেখে না।
নির্বাচনের সময় তরুণদের দরকার হয়। আন্দোলনের সময় তরুণদের দরকার হয়। মিছিলের সময় তরুণদের দরকার হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সময় তরুণদের দরকার হয়। কিন্তু সরকার গঠনের পর কর্মসংস্থান নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, স্টার্টআপ, শিল্পায়ন ও নতুন অর্থনীতির পরিকল্পনায় তরুণদের ভবিষ্যৎ কতটা কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দশক।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে আমরা হয়তো একটি সাংবিধানিক পরিবর্তনের ছবি দেখব। কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎ বদলাবে তখনই, যখন একজন গ্র্যাজুয়েট চাকরি পাওয়ার জন্য পরিচয়, সুপারিশ বা অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করবে না; যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে দূরত্ব কমবে; যখন সরকারি চাকরিই তরুণের একমাত্র স্বপ্ন হবে না; যখন উদ্যোক্তা হওয়া বাধ্যতামূলক ঝুঁকি নয়, বাস্তব সুযোগে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শুধু রাষ্ট্রপতি ভবনে নির্ধারিত হয় না। তা নির্ধারিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে, শিল্পাঞ্চলে, গবেষণাগারে এবং সেই ঘরে, যেখানে একজন তরুণ প্রতিদিন নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি খুঁজে।
আজ বাংলাদেশের সামনে তাই প্রকৃত প্রশ্নটি হলো—
আমরা কি শুধু নতুন নেতৃত্বের বাংলাদেশ গড়ছি, নাকি নতুন সম্ভাবনার বাংলাদেশও গড়ছি?
কারণ একটি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কিন্তু একটি প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন।
বাংলাদেশের আগামী ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এই উত্তর—”রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে কে বসবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দেশের লাখো তরুণ আগামীকাল কোথায় দাঁড়াবে।”

