বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের হাতে আছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ, যা অঞ্চলের বেশ কিছু এয়ারলাইনসের চেয়ে বড়। অথচ এত বিশাল সম্পদভিত্তি থাকার পরও যাত্রীসেবা কিংবা পরিচালন দক্ষতায় সেই শক্তির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্কাইট্র্যাক্সের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে রাষ্ট্রীয় এই এয়ারলাইনসকে দেওয়া হয়েছে ‘থ্রি স্টার’ রেটিং, যেখানে সমপরিমাণ বা তার চেয়ে কম সম্পদ নিয়ে চলা একাধিক প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ‘ফোর স্টার’ মর্যাদা।
স্কাইট্র্যাক্সের মূল্যায়ন অনুযায়ী, থ্রি স্টার পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার মান মোটের ওপর গ্রহণযোগ্য হলেও কোথাও না কোথাও ঘাটতি থেকে যায়। বিমানের ক্ষেত্রে সেই ঘাটতি ধরা পড়েছে ঢাকার বিমানবন্দরে দেওয়া সেবায়, উড়োজাহাজের কেবিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণে, এবং কর্মীদের ব্যবহার ও সেবাদানে ধারাবাহিকতার অভাবে। অর্থাৎ বহরের আকার বা সম্পদের পরিমাণ যতই বড় হোক, যাত্রীর বাস্তব অভিজ্ঞতায় তার প্রভাব এখনো সেভাবে পড়ছে না।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৫৪ বছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব বদলেছেন ৪৪ জন। এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এত ঘন ঘন শীর্ষ নেতৃত্ব বদলের কারণেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়িত হতে পারে না। বহর সম্প্রসারণ, খরচ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা কিংবা সেবার মান বাড়ানোর মতো উদ্যোগ প্রায়ই নতুন নেতৃত্ব আসার সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায় বা নতুন করে শুরু করতে হয়। অনেক সময় এয়ারলাইনস পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই এমন ব্যক্তিরাও শীর্ষ পদে এসেছেন, যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অর্জনের আগেই সরে গেছেন। এতে বিপুল সম্পদ ও বাজার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোনো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক এক সদস্য ও এভিয়েশন বিশ্লেষক বণিক বার্তাকে বলেছেন, কেবল সম্পদ থাকলেই কোনো এয়ারলাইনস লাভজনক বা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায় না। তাঁর ভাষ্যে, বিমানের প্রধান দুর্বলতা পেশাদার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। ৫৪ বছরে ৪৪ জন সিইও বদল হওয়া এবং বহু ক্ষেত্রে খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার কারণে ধারাবাহিক ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। তাঁর মতে, র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা এয়ারলাইনসগুলোর মূল শক্তি হলো পেশাদার পরিচালনা, যা বিমানের এখনো অনুপস্থিত।
বর্তমানে বিমানের বহরে সক্রিয় উড়োজাহাজের সংখ্যা ১৯টি। এর মধ্যে রয়েছে দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮, চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ। এই বহর দিয়েই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৮৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যা এখন পর্যন্ত তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে মুনাফার এই চিত্রের পাশাপাশি রয়েছে বড় অংকের দায়ও। জ্বালানি তেলের মূল্য বাবদ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং অ্যারোনটিক্যাল চার্জ বাবদ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে সংস্থাটির দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকায়, সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী।
তুলনামূলক কম সম্পদ ও ছোট বহর নিয়েও বিশ্বের কিছু এয়ারলাইনস ফোর স্টার রেটিং ধরে রেখেছে। মাত্র ১২টি উড়োজাহাজ নিয়ে পরিচালিত রয়্যাল ব্রুনাই এয়ারলাইনসের সম্পদমূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও তারা ফোর স্টার রেটিং পেয়েছে, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি। ২৩টি উড়োজাহাজের বহর নিয়ে চলা আরেকটি ফোর স্টার প্রতিষ্ঠান তাদের ২০২৫ সালের হিসাবে মোট সম্পদ প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা, আর সেই বছর মুনাফা করেছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এদিকে লুক্সেমবার্গভিত্তিক একটি এয়ারলাইনস, যার বহরে ২৪টি উড়োজাহাজ রয়েছে এবং সম্পদমূল্য বিমানের কাছাকাছি, তারাও ধরে রেখেছে ফোর স্টার মর্যাদা।
এ প্রসঙ্গে একটি এভিয়েশন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বণিক বার্তাকে বলেছেন, বিমানের সাম্প্রতিক মুনাফা ইতিবাচক হলেও শুধু সম্পদ বা মুনাফার অংক দিয়ে কোনো এয়ারলাইনসের প্রকৃত সক্ষমতা বিচার করা যায় না। উড়োজাহাজ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, আন্তর্জাতিক স্লট প্রভৃতি সম্পদ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে আয় তৈরি করা যাচ্ছে, সেটিই আসল বিবেচ্য বিষয়। তাঁর মতে প্রকৃত দেনা, সম্পদের বিপরীতে রিটার্ন এবং সামগ্রিক পরিচালন দক্ষতাও একসঙ্গে দেখতে হবে।
আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিমানের স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৭১৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যার প্রায় ৮৮ শতাংশ বা ৯ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকাই উড়োজাহাজ ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম বাবদ। বাকি অংশে রয়েছে জমি-ভবন, গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্ট, আসবাব ও অন্যান্য সরঞ্জাম এবং জরুরি যন্ত্রাংশ। স্থায়ী ও চলতি সম্পদ মিলিয়ে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা।
আগামী কয়েক বছরে বিমানের সম্পদের আকার আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বোয়িংয়ের সঙ্গে সম্প্রতি ১০টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও চারটি ৭৩৭ ম্যাক্সসহ মোট ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার একটি চুক্তি করেছে সংস্থাটি, যার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। প্রথম উড়োজাহাজটি হাতে আসার কথা ২০৩১ সালের নভেম্বরে, বাকিগুলো পাওয়া যাবে ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে। পাশাপাশি এয়ারবাসও ১০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যা এখন মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের পরিমাণ যেমন বাড়বে, তেমনি সেই সম্পদ থেকে পর্যাপ্ত আয় করে দেখানোর চাপও বাড়বে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনী কর্মকর্তা ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ বণিক বার্তাকে জানান, এভিয়েশন মূলত পুঁজিনির্ভর একটি ব্যবসা, তাই কোনো এয়ারলাইনসের সক্ষমতা কেবল সম্পদের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। বরং সেই সম্পদ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে আয় ও মুনাফা তৈরি করা যাচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, গত বছরের প্রায় ৮০০ কোটি টাকা মুনাফার ধারা টিকিয়ে রাখতে হলে উড়োজাহাজের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, বহর ও রুটের সমন্বয় ঘটানো, জনবল ও পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আসনপ্রতি আয় বাড়ানো জরুরি। তিনি আরও বলেন, কার্যকর হাব-অ্যান্ড-স্পোক ব্যবস্থার অভাব বিমানের একটি বড় দুর্বলতা, যার ফলে বড় উড়োজাহাজগুলো অনেক সময় পুরো সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না, আর অতিরিক্ত জনবল ও পরিচালন ব্যয়ও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তাঁর পরামর্শ, শুধু হিসাবের খাতায় মুনাফা দেখালেই চলবে না, অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো শক্তিশালী করাও একইভাবে জরুরি, কারণ বড় অংকের দেনা ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায় থাকায় দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে নগদ অর্থপ্রবাহ অপরিহার্য। পাশাপাশি কোন রুটে কত যাত্রী মিলছে, কোন উড়োজাহাজে আসন খালি থাকছে এবং কোন রুট থেকে প্রকৃত আয় হচ্ছে, তা নিয়মিত বিশ্লেষণ করে বহর ও রুট পরিকল্পনা সাজানো দরকার।
যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিমানের মুনাফা ছিল ৭৮৫ কোটি টাকা, যা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে এই রেকর্ড মুনাফার পাশাপাশি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, পদ্মা অয়েলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় অংকের দায়ও রয়ে গেছে, যা মূলত বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহারের ফি এবং জ্বালানি বিল বাবদ সৃষ্ট। ফলে আয় ও মুনাফা বাড়লেও দেনা পরিশোধ ও নগদ অর্থপ্রবাহ ঠিক রাখা প্রতিষ্ঠানটির জন্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি, বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও গত সাত বছরের চার বছরই তারা মুনাফা করেছে এবং সরকারি কোষাগারে প্রায় ১১০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। তাদের ভাষ্যে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পাওনাও নিয়মিত পরিশোধের মাধ্যমে কমিয়ে আনা হচ্ছে এবং নতুন উড়োজাহাজ কেনার ঋণের কিস্তিও নিয়মিতভাবে শোধ করা হচ্ছে।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানের ওপর বড় ধরনের অসংগতিপূর্ণ ঋণের বোঝা নেই এবং নিয়মিত পাওনা পরিশোধের কারণে দেনা দ্রুত কমে আসছে, যা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতাকে ইতিবাচক জায়গায় রাখছে। তিনি আরও বলেন, ৫৪ বছরের ঐতিহ্য ও সক্ষমতার কারণে বিমানের সামনে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী জনগোষ্ঠী এই এয়ারলাইনসের জন্য বড় একটি বাজার—সৌদি আরবের পাশাপাশি জাপান, কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরেও প্রচুরসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী কাজ করছেন। এই বাজারকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বিমানের আন্তর্জাতিক ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হওয়া সম্ভব বলে তাঁর অভিমত।
তিনি এ-ও উল্লেখ করেন, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হলেও সরকারি মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের কারণে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বিমানের নেই। বিশ্বের বড় বড় এয়ারলাইনস অনেক বেশি স্বাধীনভাবে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন, তবে বর্তমান কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
সব মিলিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চিত্রটি দাঁড়ায় এমন—বিশাল সম্পদ, বাড়তে থাকা বহর এবং রেকর্ড মুনাফা থাকলেও তা সেবার মান বা আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে এখনো পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না। ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন, পেশাদার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, বড় অংকের দেনা এবং হাব-অ্যান্ড-স্পোক কাঠামোর অনুপস্থিতি—এই কয়েকটি জায়গায় দৃশ্যমান উন্নতি না হলে সম্পদ বা মুনাফার প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রতিযোগী এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে ব্যবধান ঘোচানো কঠিন থেকে যাবে বলেই মত দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

