রাজধানীর গুলশানে সরকারি অর্থে নির্মিত একটি বিশাল খেলার মাঠ এখন বাণিজ্যিক ভাড়ার আওতায়, আর সেই মাঠের বাইরে গাছের ফাঁকফোকরে খেলতে বাধ্য হচ্ছে এলাকার শিশু-কিশোরেরা। গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদের ঠিক উল্টো দিকে প্রায় সাড়ে আট একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই পার্ক ও মাঠে গাছপালার তুলনায় খোলা মাঠের পরিমাণই বেশি। কিন্তু এত বড় জায়গা থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন বিকেলে স্থানীয় শিশুরা খেলছে পার্কের গাছের ফাঁকে থাকা সংকীর্ণ জায়গায়—কারণ, বড় মাঠে খেলতে হলে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। জানা গেছে, সরকারি মাঠ ভাড়া দিয়ে দিনে ২ লক্ষাধিক টাকা আয় গুলশান ইয়্যুথ ক্লাবের।
স্থানীয় এক কিশোর জানায়, বড় মাঠে খেলতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্লট বুক করতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় যথেষ্ট অর্থের। টাকা জোগাড় হলে তবেই স্লট নিয়ে খেলা যায়, নয়তো মাঠমুখী হওয়ারই সুযোগ থাকে না। আরেক কিশোরের ভাষ্য, মাঝেমধ্যে টাকা জমিয়ে তারা মাঠে খেলতে আসে, আর টাকা না থাকলে বাধ্য হয়ে কাছাকাছি কোনো খালি জায়গায় গিয়ে খেলে।
সম্প্রতি এক শনিবার বিকেলে দেখা যায়, যখন স্থানীয় শিশুরা পার্কের গাছের ফাঁকে খেলছে, তখন মাঠের মূল অংশে চলছে একটি ক্লাবে নিবন্ধিত খেলোয়াড়দের ক্রিকেট প্রশিক্ষণ। অন্যদিকে নির্ধারিত ফুটবল টার্ফে চড়া মূল্যে ভাড়া নিয়ে খেলছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা—যে ভাড়া আদায় করেছে মাঠ নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠন গুলশান ইয়্যুথ ক্লাব।
জানা গেছে, ২০২২ সালে এই মাঠের আধুনিকায়ন ও সংস্কারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয় করেছিল। নগরবাসীর করের টাকায় তৈরি এই মাঠ তাই নীতিগতভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষ তো বটেই, সাংবাদিকদের মাঠে প্রবেশ করতে গিয়েও নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
এ বিষয়ে গুলশান ইয়্যুথ ক্লাবের মহাসচিব দাবি করেন, মাঠটি সবার জন্য উন্মুক্ত এবং কাউকে বাধা দেওয়া হয় না, শুধু ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আগেভাগে স্লট বুকিং দিতে হয়। তাঁর ভাষ্যমতে, মাঠের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থেই এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ভাড়ার অর্থ আয়ের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয় না বলেও দাবি করেন তিনি; তাঁর মতে, মাঠ পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে ব্যয় হয়, তা থেকেই সদস্যদের চাঁদার পাশাপাশি সামান্য কিছু অর্থ নেওয়া হয়।
তবে ক্লাবের নিজস্ব ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বিভিন্ন খেলার জন্য প্রতিটি স্লটের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে বেশ উঁচু হারে—ফুটবল টার্ফে দেড় ঘণ্টার জন্য কয়েক হাজার টাকা, ব্যাডমিন্টন-টেনিসে কয়েকশ থেকে হাজার টাকার বেশি, বাস্কেটবলে দুই থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা, সাঁতারে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার টাকা এবং জিমনেসিয়ামে ব্যায়ামের জন্যও নেওয়া হয় বড় অঙ্কের ফি।
সাপ্তাহিক স্লট বুকিং ও মূল্যতালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিটি খেলার সুবিধা থেকেই ক্লাবটির নিয়মিত আয় হচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ফুটবল টার্ফ, টেনিস কোর্ট, বাস্কেটবল কোর্ট, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, সুইমিং পুল ও জিমনেসিয়াম—এই ছয়টি সুবিধা থেকে মিলিত আয় দাঁড়ায় দৈনিক গড়ে দুই লাখ টাকারও বেশি। এর বাইরে ক্রিকেট মাঠ ও নেট প্র্যাকটিসের জন্যও আলাদাভাবে অর্থ নেওয়া হয়, যার সুনির্দিষ্ট মূল্য ওয়েবসাইটে উল্লেখ নেই। সব মিলিয়ে মাসে এই মাঠ থেকে ক্লাবটির আয় প্রায় সত্তর লাখ টাকা ছুঁতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০০০ সালে প্রণীত খেলার মাঠ ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, সরকারি বা যেকোনো পাবলিক মাঠ-পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ভাড়া বা ইজারা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নব্বইয়ের দশকে এই পার্কের একাংশে একটি বিনোদন পার্ক পরিচালিত হয়েছিল, যার বৈধতা নিয়ে মামলা গড়ায় উচ্চ আদালত পর্যন্ত। ২০০৯ সালে আদালত সরকারি মাঠের বাণিজ্যিক ব্যবহারকে অবৈধ ঘোষণা করে এটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দেন, এবং সেই রায়ের ভিত্তিতে তৎকালীন স্থাপনা উচ্ছেদও করা হয়।
এরপর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সহায়তায় মাঠটির নিয়ন্ত্রণ নেয় গুলশান ইয়্যুথ ক্লাব, যদিও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এতে আপত্তি ছিল। ২০১৩ সালে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলে ক্লাবটি আদালতের শরণাপন্ন হয়, তবে ২০২২ সালের সর্বশেষ রায়েও ক্লাবটি হেরে যায় এবং আদালত পুনরায় মাঠটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দেন। তবে বাস্তবতা হলো, একসময় যে সংস্থা এই ক্লাবকে মাঠ থেকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিল, তারাই এখন চুক্তির মাধ্যমে মাঠ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তুলে দিয়েছে সেই ক্লাবের হাতেই।
মাঠটি উন্মুক্ত রাখার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করা সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী বলেন, খেলার মাঠ-পার্ক আইনে বাণিজ্যিক ব্যবহার সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ, আর এই নির্দিষ্ট মাঠ নিয়ে আদালতের দুটি পৃথক রায়েও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তর আইন ও আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে মাঠটি ক্লাবের হাতে তুলে দিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারপ্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে মাঠ-পার্ক জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তা লঙ্ঘিত হচ্ছে, যা আইনের লঙ্ঘন ও জনস্বার্থবিরোধী অবস্থান বলে তিনি মনে করেন।
এ বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জানান, মাঠ নির্মাণ তাঁদের কাজ হলেও পরিচালনার দায়িত্ব তাঁদের নয়। প্রাথমিকভাবে সিটি করপোরেশনকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা শর্ত মানেনি বলে তিনি জানান। পরে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি পরিচালনা কমিটিও ব্যর্থ হওয়ার পর যোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান না পেয়ে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ক্লাবটিকে মাঠ দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন। বাণিজ্যিক ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটিকে তিনি বাণিজ্যিক ব্যবহার মনে করেন না, বরং পরিচালনার ন্যূনতম খরচ মেটাতেই এই ফি নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
একজন নগর পরিবেশবিদ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নতুন প্রজন্মের বিকাশের জন্য খেলার মাঠ অপরিহার্য, অথচ গত দুই দশকে ঢাকায় উন্মুক্ত খেলার মাঠের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। দুই সিটি করপোরেশনের মোট ওয়ার্ডের তুলনায় বর্তমানে সচল মাঠের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। তাঁর মতে, সরকারি মাঠ বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেওয়া এবং তা মূলত সচ্ছল শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত রাখার প্রবণতা অত্যন্ত দুঃখজনক, কারণ চড়া মূল্যে সন্তানকে খেলতে পাঠানো এই শহরের অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের একজন অধ্যাপক প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্র মাঠ-পার্ক রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থ হলে তাহলে জনগণের কাছ থেকে কর আদায়ের যৌক্তিকতা কোথায়। তাঁর মতে, একটি বাসযোগ্য নগরীর জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান অপরিহার্য, যেখানে মানুষ হাঁটতে ও খেলতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে যেখানে একসঙ্গে কয়েকশ শিশু-কিশোরের খেলার কথা, সেই মাঠ অর্থের বিনিময়ে হাতে গোনা কিছু বিত্তবান মানুষের জন্য সংরক্ষিত করে রাখা হচ্ছে। জনগণের করের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তিনি তুলে ধরেন—সড়ক অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হলে মাঠ ব্যবস্থাপনায় কেন তা সম্ভব নয়, সেই যুক্তিসংগত প্রশ্নও রাখেন তিনি।

