ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে এক মাসব্যাপী বিশেষ মশক নিধন অভিযান। বিশ্ব মশা দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর একটি স্কুলের সামনে থেকে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
সংস্থাটি জানিয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিহ্নিত নগরীর আটটি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এসব এলাকায় অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করে মশার প্রজননস্থল খুঁজে বের করা, লার্ভা ধ্বংস করা এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হবে।
সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে জৈবিক লার্ভিসাইড ব্যবহারের ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তিনি জানান, গত বছর এই সময়ে সিটি করপোরেশন এলাকায় আটশর বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল, যেখানে চলতি বছরে এই সংখ্যা পাঁচশ পঞ্চাশ থেকে পাঁচশ আশির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত বছর একই সময়ে আটজনের মৃত্যু হলেও চলতি বছর এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
তিনি জানান, নগরীর দুই, তিন, সতেরো, আঠারো, উনিশ, বত্রিশ, চৌত্রিশ ও ঊনচল্লিশ নম্বর ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ওয়ার্ডে বিশেষ নজরদারি নিশ্চিত করতে শতাধিক কর্মীকে ইতিমধ্যে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, এবং নগরীর অন্যান্য এলাকায়ও নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালু থাকবে বলে তিনি জানান।
তাঁর ভাষ্যমতে, শুধু ওষুধ প্রয়োগেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়—মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি থেকে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করে তা ধ্বংস করার কার্যক্রমও চলবে।
মশক নিধন কার্যক্রম তদারকির জন্য সিটি করপোরেশনের দশজন ম্যাজিস্ট্রেটকে বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাঁরা আগামী এক মাস নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবেন। কোথাও মশার লার্ভা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে জরিমানা বা কারাদণ্ডও দেওয়া হতে পারে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও নেওয়া হয়েছে পৃথক কর্মসূচি। শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে লিফলেট বিতরণ ও বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রম চালানো হবে, যাতে সহযোগিতা করবে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ কয়েকটি সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা বলেন, মশক নিধনের পাশাপাশি নগরীর সার্বিক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নালা-নর্দমা, ড্রেন, নির্মাণাধীন ভবন ও পরিত্যক্ত এলাকায় জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, নগরবাসীর সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব বা পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমতে না দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
তিনি আরও জানান, বিশ্ব মশা দিবস উপলক্ষে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও প্রকৃতপক্ষে গত দুই-তিন মাস ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সিটি করপোরেশন, যা সরাসরি তদারকি করছেন মেয়র নিজে।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশেষ অভিযান শেষে নগরীর একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ডেঙ্গুবিষয়ক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। এতে সিটি করপোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, বিভিন্ন অঞ্চলের ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী কর্মকর্তা, মশক নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মকর্তারা এবং রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকসহ একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

