একজন নারী হাঁটছেন, দাঁড়িয়ে আছেন কিংবা নিজের মতো করে কোথাও যাচ্ছেন। কিন্তু ক্যামেরার চোখ তার মুখ, বক্তব্য, পরিচয় বা ঘটনার দিকে নয় তার শরীরের নির্দিষ্ট অংশের দিকে নিবদ্ধ। তারপর সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। নিচে শুরু হয় অশালীন মন্তব্য, শরীর নিয়ে কটূক্তি, ইঙ্গিতপূর্ণ বাক্য আর তথাকথিত ‘মজার’ নামে দলবদ্ধ অমানবিকতা।
প্রশ্ন হলো এটা কি সাংবাদিকতা? নাকি ডিজিটাল যুগের নতুন ধরনের নোংরা উঁকিঝুঁকি?
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানগুলো দেখাচ্ছে, নারীদের অজান্তে বা অপ্রস্তুত মুহূর্তে ধারণ করা ভিডিওকে অনেক ফেসবুক পেজ ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে ফ্রেম করছে, যাতে সংবাদ নয়, নারীর শরীরই হয়ে ওঠে মূল আকর্ষণ। জুম, স্লো মোশন, পেছন থেকে ধারণ, নির্দিষ্ট অঙ্গের ওপর অপ্রয়োজনীয় ফোকাস, এসবকে সাংবাদিকতার নামে চালানো হচ্ছে। এমনকি সংবাদমাধ্যমের আদলে পরিচালিত বহু পেজের বিরুদ্ধে নারীকে ‘কনটেন্ট’ বানিয়ে ভিউ ও আয়ের অভিযোগও উঠে এসেছে।
সংবাদে ক্যামেরা থাকবে, কিন্তু ক্যামেরারও কি বিবেক থাকবে না?
জনপরিসরে ভিডিও ধারণ করা আর কাউকে শরীর হিসেবে পণ্য বানানো এক বিষয় নয়।
সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হলো তথ্য দেওয়া, ক্ষমতাকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো, জনস্বার্থের বিষয় তুলে ধরা। কিন্তু যখন ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল এমনভাবে বেছে নেওয়া হয়, যার কোনো সংবাদমূল্য নেই, যখন একজন নারীর শরীরকে ইচ্ছাকৃতভাবে দর্শকের যৌন কৌতূহলের কেন্দ্রে পরিণত করা হয় তখন সেটি আর সাংবাদিকতা থাকে না। সেটি নারীকে অবজেক্টিফাই করা।
সেটি মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, ভিউ পাওয়ার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এই নোংরামির বাজার তৈরি করে শুধু ভিডিও নির্মাতা নয়; নিচে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার দর্শকও। একজন শরীর নিয়ে কটূক্তি করে, আরেকজন হাসির রিয়্যাক্ট দেয়, তৃতীয়জন শেয়ার করে। তারপর সবাই মিলে বলে—“আরে ভাই, মজা করেছি!” কোন মজা? কার অপমানের বিনিময়ে মজা?
কমেন্ট বক্সে যারা ‘পরহেজগার’, তাদের নৈতিকতা কোথায়?
আমাদের সমাজে নারীর পোশাক, চলাফেরা, হাসি, ছবি সবকিছু নিয়ে নীতিবাক্য শোনানোর লোকের অভাব নেই। কিন্তু সেই একই মানুষ যখন একটি নারীর শরীর নিয়ে অশালীন মন্তব্য করে, তখন তার নৈতিকতার মুখোশ খুলে যায়।
- যে ব্যক্তি অন্যের শরীর নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে, সে ভদ্রতার প্রতিনিধি নয়।
- যে ব্যক্তি বডি শেমিং করে, সে রসিক নয়।
- যে ব্যক্তি নারীর ভিডিও দেখে অশালীন মন্তব্যে অংশ নেয়, সে শুধু একটি মন্তব্য করছে না সে অনলাইন হয়রানির সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণাতেও ফেসবুক মন্তব্যে নারীবিদ্বেষী বুলিংয়ের ব্যাপক উপস্থিতি পাওয়া গেছে; একটি গবেষণায় বিশ্লেষিত মন্তব্যের প্রায় ৪৬.৫৭ শতাংশকে misogynistic bullying হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের অসভ্যতা নয়। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি।
বডি শেমিং কোনো ‘মজা’ নয়, এটি চরিত্রের দেউলিয়াত্ব
মানুষ তার শরীরের গঠন নিয়ে জন্ম নেয়। কারও শরীর মোটা, কারও চিকন, কারও উচ্চতা কম, কারও বেশি। কারও শরীরের আকৃতি নিয়ে প্রকাশ্যে অপমান করা মানে শুধু তাকে হাসির পাত্র বানানো নয় তার ব্যক্তিগত মর্যাদার ওপর আঘাত করা।
সবচেয়ে বড় কথা, যারা অন্যের শরীর নিয়ে উপহাস করে, তারা আসলে নিজেদের মানসিক উচ্চতা প্রকাশ করে।
আপনার চোখ যদি একজন মানুষের শরীরের বাইরে তার ব্যক্তিত্ব দেখতে না পারে, তাহলে সমস্যাটি তার শরীরে নয় সমস্যাটি আপনার দৃষ্টিতে।
প্রতিবাদ চাই, কিন্তু অমানবিক প্রতিশোধ নয়
যারা এ ধরনের ভিডিও তৈরি করে, যারা অশালীন মন্তব্য করে, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার অর্থ কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করা, পরিবারকে আক্রমণ করা বা পাল্টা অপমানের উৎসব করা নয়।
প্রতিবাদের পথ হওয়া উচিত
- অশালীন ভিডিও ও মন্তব্য রিপোর্ট করা;
- সংশ্লিষ্ট পেজ ও প্ল্যাটফর্মকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো;
- সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে প্রকাশ্য প্রশ্ন তোলা;
- পরিচিতজনদের মধ্যে এমন আচরণকে ‘মজা’ বলে স্বাভাবিকীকরণ না করা;
- প্রয়োজনে আইনগত প্রতিকার ও ভুক্তভোগীর সহায়তার পথ অনুসরণ করা।
কারণ নোংরামির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমরা যদি আরেক ধরনের নোংরামি করি, তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?
অবশেষে, আজ একজন অপরিচিত মেয়েকে পেছন থেকে ভিডিও করে তার শরীরকে কনটেন্ট বানানো হচ্ছে। কমেন্ট বক্সে তার শরীর নিয়ে উৎসব হচ্ছে।
আজ আমরা স্ক্রল করে চলে যাচ্ছি। কিন্তু কাল যদি সেই ক্যামেরা আপনার মা, বোন, স্ত্রী, মেয়ে কিংবা প্রিয়জনের অপ্রস্তুত মুহূর্তকে এভাবেই শিকার করে?
তখনও কি বলবেন—“আরে, ভিডিও তো পাবলিক প্লেসেই করা হয়েছে!” নাকি তখন বুঝবেন, ক্যামেরার স্বাধীনতা আর মানুষের মর্যাদার মাঝখানে একটি সীমারেখা আছে?
সাংবাদিকতা যদি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে না পারে, তবে সেটি সাংবাদিকতা নয়।
আর সমাজ যদি নারীর অপমান দেখে বিনোদন খুঁজে পায়, তবে প্রশ্নটা শুধু একটি ভিডিও নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা আসলে কেমন মানুষ হয়ে উঠছি?
একটি মেয়ের শরীর কি এখন সংবাদ? নাকি আমাদের চোখই এতটাই অসুস্থ হয়ে গেছে যে মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখতে পারছে না?
মিজান মাজনুন
সাংবাদিক ও আইনজীবী

