নাটোরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসক ও দুজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও নানা প্রশ্ন। গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন এবং লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহকে প্রত্যাহার করা হয়, আর পরদিন বুধবার একই পরিণতি হয় বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাকের।
এই প্রত্যাহারের আগে লালপুর ও বাগাতিপাড়ার ইউএনও কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিল উপজেলা প্রশাসন। তবে অভিযোগ দায়েরের তিন দিন পার হয়ে গেলেও এখনো তা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি।
জানা গেছে, লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহকে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করে এবং জেলা প্রশাসক আসমা শাহীনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে প্রত্যাহার করা হয়। এর একদিন পর একই প্রক্রিয়ায় বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাককেও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
এই প্রত্যাহারের সঙ্গে থানায় দেওয়া অভিযোগের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে জেলাজুড়ে চলছে জোর আলোচনা। স্থানীয় সুশীল সমাজের একটি অংশ বিষয়টিকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখছে না। তবে বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, অভিযোগ দায়েরের সঙ্গে বদলি বা প্রত্যাহারের কোনো সংযোগ তারা দেখছেন না।
সদ্য বিদায়ী দুই ইউএনও এই বদলি প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিদায়ী জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে বলেন, সরকারি চাকরিতে বদলির আদেশ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনার সম্পর্ক তিনি দেখছেন না।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট দুপুরে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল বাতিলের দাবিতে লালপুর ও বাগাতিপাড়ার ইউএনও কার্যালয়ে বিক্ষোভ করেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এই বিক্ষোভের জেরে কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং কয়েকজনকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দুই উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বাদী হয়ে গত ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় সংশ্লিষ্ট থানায় পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। বাগাতিপাড়ায় সাতজনের নাম উল্লেখসহ দেড়শর কাছাকাছি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়, আর লালপুরে আঠারো জনের নাম উল্লেখসহ ষাট থেকে সত্তর জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগ দায়েরের ঠিক পরের দিনই শুরু হয় প্রশাসনিক রদবদল—প্রথমে দুই ইউএনও ও জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করা হয়, পরে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারকেও একইভাবে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক আন্দোলনের নাটোর জেলার একজন প্রতিনিধি এ বিষয়ে বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে মিছিল করে ফলাফল বাতিলের দাবি জানিয়েছেন এবং এই বিক্ষোভের সময় ইউএনও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা স্বাভাবিক পদক্ষেপ হলেও, অভিযোগ দায়েরের পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়াটা স্বাভাবিক ঘটনা নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর আশঙ্কা, এতে প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে এবং তাঁরা ভবিষ্যতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সাহস নাও পেতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া যেতেই পারে, তবে ঢালাওভাবে দলীয় পদ-পদবি উল্লেখ করে নেতাদের নাম জড়ানোর মধ্যে ষড়যন্ত্রের আভাস আছে বলে তাঁরা মনে করেন। তবে কর্মকর্তাদের বদলির সঙ্গে এই অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে লালপুর ও বাগাতিপাড়ার প্রশাসনিক কর্মকর্তারা গত সোমবার সন্ধ্যায় সংশ্লিষ্ট থানায় পৃথক লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও তিন দিন পার হয়ে যাওয়ার পরও তা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা অভিযোগ জমা দিয়ে পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছেন।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও মামলা রেকর্ড না হওয়ার কারণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বাগাতিপাড়া থানার একজন উপপরিদর্শকও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
জেলা পুলিশ সুপার এ বিষয়ে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ অবহিত করেননি এবং তিনি নিজেও এখনো এ ব্যাপারে খোঁজ নেননি। নতুন কোনো তথ্য পেলে তা জানানো হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

