ইউরোপে একটি ভালো জীবনের আশায় দেশ ছাড়েন বহু বাংলাদেশী। কারও লক্ষ্য ইতালি, কারও গন্তব্য গ্রিস বা স্পেন। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটানো, নিজের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া কিংবা স্বজনদের জন্য একটু স্বচ্ছল জীবন নিশ্চিত করার স্বপ্নেই অনেকে পাড়ি জমান অচেনা পথে। কিন্তু বৈধ অভিবাসনের পরিবর্তে অনিয়মিত পথে ইউরোপে পৌঁছানোর এই আকাঙ্ক্ষা অনেকের জন্য শেষ হয়েছে ভয়াবহ পরিণতিতে।
গত এক দশকের তথ্য বলছে, এই বিপজ্জনক যাত্রায় প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ১৮৮ বাংলাদেশী। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট’-এর বৈশ্বিক তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের নয়টি অনিয়মিত অভিবাসনপথে ৮৪টি পৃথক দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ১ হাজার ৩২৯ বাংলাদেশী মারা গেছেন এবং ৮৫৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
অর্থাৎ নথিভুক্ত হিসাবেই এক দশকে ২ হাজার ১৮৮ বাংলাদেশী মৃত্যুবরণ করেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন।
তবে এই সংখ্যা যে প্রকৃত চিত্রের পুরোটা তুলে ধরে না, সেটিই আরও উদ্বেগের বিষয়। সমুদ্রপথে অনেক নৌযান কোনো ধরনের উদ্ধার অভিযান ছাড়াই হারিয়ে যায়। সেখানে কতজন যাত্রী ছিলেন, কতজন মারা গেছেন কিংবা কতজন নিখোঁজ—এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে নথিতে থাকা সংখ্যা আসলে সর্বনিম্ন নিশ্চিত হিসাব হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
৩৮ জন উঠেছিলেন নৌকায়, ফিরলেন না ১০ জন
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তবরুক থেকে একটি রাবারের নৌকায় উঠেছিলেন ৩৮ বাংলাদেশী। তাদের লক্ষ্য ছিল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছানো। ইউরোপের মাটিতে পা রাখার সেই স্বপ্ন অবশ্য মাঝসমুদ্রেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার পর কোনো খাবার বা পানি ছাড়াই টানা ১০ দিন সাগরে ভাসতে হয় যাত্রীদের। এর মধ্যে মারা যান ৯ বাংলাদেশী। তাদের মরদেহ সাগরেই ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা।
বেঁচে থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীরা শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছান। পুলিশ তাদের অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। কিন্তু সেখানেও মৃত্যুর মিছিল থামেনি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের তরুণ মেহেদী হাসান মারা যান। এরপর ১৬ আগস্ট একই উপকূল থেকে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একটি উন্নত জীবনের আশায় যাত্রা শুরু হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই যাত্রা পরিণত হয়েছে একাধিক পরিবারের জন্য স্বজন হারানোর বেদনায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর পথ ভূমধ্যসাগর
বাংলাদেশীদের ইউরোপযাত্রায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী পথ হলো ভূমধ্যসাগর। বিশেষ করে লিবিয়া বা তিউনিসিয়া থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।
এই পথে ১ হাজার ১৭১ বাংলাদেশী মারা গেছেন এবং ৭৭৩ জন নিখোঁজ হয়েছেন। অর্থাৎ মৃত্যু ও নিখোঁজের মোট ঘটনার প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি এই একটি পথেই ঘটেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বছর ছিল ২০১৫ সাল। ওই বছর মাত্র চারটি ঘটনায় ৯২৪ বাংলাদেশী নিহত এবং ৩৬৩ জন নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত হন। অর্থাৎ শুধু এক বছরেই এই পথে মৃত ও নিখোঁজ বাংলাদেশীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ২৮৭।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, ভূমধ্যসাগর বাংলাদেশীদের জন্য শুধু ইউরোপে যাওয়ার একটি পথ নয়; এটি একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় মৃত্যুঝুঁকির পথ।
সমুদ্রের ঢেউয়ের বাইরেও বিপদ
ইউরোপে যাওয়ার অনিয়মিত পথের বিপদ শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ নয়। যাত্রাপথে রয়েছে সাহারা মরুভূমি, দুর্গম সীমান্ত, মানব পাচারকারী চক্র এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়ে অন্তত ৩৮ বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকা বা আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার পথে মারা গেছেন আরও ১ জন, নিখোঁজ হয়েছেন ২২ জন।
তুরস্ক হয়ে ইউরোপের স্থলপথেও প্রাণ গেছে ২০ বাংলাদেশীর।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথেও মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। লিবিয়া থেকে গ্রিসের ক্রিট বা অন্যান্য দ্বীপে যাওয়ার পথে ৫ বাংলাদেশী মারা গেছেন। ইরান হয়ে তুরস্ক এবং ইতালি থেকে ফ্রান্সে যাওয়ার পথেও বাংলাদেশীদের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ ইউরোপের পথে বিপদ শুরু হয় সীমান্ত পেরোনোর আগেই এবং শেষ হয় না সমুদ্রের তীরে পৌঁছানোর পরও।
সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা—নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষা
মৃত্যুর খবর অন্তত একটি পরিবারের কাছে চূড়ান্ত বাস্তবতা নিয়ে আসে। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার বেদনা আরও দীর্ঘ।
লিবিয়া থেকে ২০২৪ সালে এক বাংলাদেশী তরুণ নৌকায় উঠেছিলেন। পরিবারের কাছে সেটিই ছিল তার শেষ যোগাযোগ। তার শেষ বার্তা ছিল—‘ইতালি পৌঁছলে ফোন দেব।’
কিন্তু সেই ফোন আর আসেনি।
পরিবারের সদস্যরা মাসের পর মাস দালাল, পরিচিতজন এবং বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত জানা যায়নি তিনি ভূমধ্যসাগরে ডুবে গেছেন, নাকি অন্য কোনো পথে হারিয়ে গেছেন। কোনো মরদেহ নেই, নিশ্চিত মৃত্যুসংবাদও নেই। ফলে পরিবারটির কাছে অপেক্ষাই হয়ে আছে একমাত্র বাস্তবতা।
আইওএমের হিসাবে ৮৫৯ বাংলাদেশী নিখোঁজ। তাদের অনেকের মরদেহ কখনো উদ্ধার হয়নি। আবার অনেক দুর্ঘটনার কোনো আনুষ্ঠানিক নথিও তৈরি হয়নি।
ফলে একটি পরিবার হয়তো বছরের পর বছর অপেক্ষা করে—স্বজন ফিরবেন, নাকি কোনো একদিন মৃত্যুর খবর আসবে।
ইউরোপের স্বপ্ন কেন এত শক্তিশালী?
এই বিপজ্জনক পথের পেছনে শুধু দারিদ্র্য নয়, রয়েছে সামাজিক চাপ, দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির আকাঙ্ক্ষা এবং দালালদের তৈরি করা ইউরোপের আকর্ষণীয় ছবি।
অনেকেই জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। কেউ কেউ ১৫-২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
প্রথমে মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকার কোনো দেশে পৌঁছানো হয়। এরপর শুরু হয় আরও বিপজ্জনক যাত্রা। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি জানানো হয় না। বরং তাদের সামনে তুলে ধরা হয় ইউরোপে পৌঁছে দ্রুত অর্থ উপার্জন এবং পরিবারের জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন।
সমস্যা হলো, একবার এই যাত্রা শুরু হয়ে গেলে ফিরে আসার পথও অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশীরাই কেন এত বেশি?
আইওএমের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালিতে পৌঁছানো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে বাংলাদেশীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি-এপ্রিল, ভূমধ্যসাগরীয় পথ ব্যবহার করে মোট ৮ হাজার ৫৭৭ অভিবাসনপ্রত্যাশী ইতালিতে পৌঁছেছেন। তাদের ৩০ শতাংশের উৎস দেশ বাংলাদেশ।
যদিও ২০২৫ সালের একই সময়ে এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ, তবুও চলতি বছরের প্রথম চার মাসেও বাংলাদেশই এই পথের প্রধান উৎস দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
পথটি মূলত উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো, বিশেষ করে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত হয়।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথেও বাংলাদেশীদের উপস্থিতি দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে এই পথ ব্যবহারকারী অভিবাসীদের মাত্র ৪ শতাংশ ছিলেন বাংলাদেশী। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ১৬ শতাংশ।
অর্থাৎ একটি বিপজ্জনক পথের ওপর নির্ভরতা শুধু পুরোনো নয়, কিছু ক্ষেত্রে তা আরও বাড়ছে।
অনিয়মিত পথে ইউরোপযাত্রা বাড়ছেই
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ২৭ জুলাই পর্যন্ত স্থল ও সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করেছেন ৭ হাজার ৯৬৯ বাংলাদেশী।
এর আগের বছরগুলোতেও সংখ্যাটি ছিল উল্লেখযোগ্য।
- ২০২৫ সালে স্থল ও সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ২৪ হাজার ৩১৮ বাংলাদেশী।
- ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৩০৪।
- ২০২৩ সালে গেছেন ১৩ হাজার ৭৭৩ জন।
- ২০২২ সালে গেছেন ১৬ হাজার ৪৮৭ জন।
- আর ২০২১ ও ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ৯৫৫ ও ৪ হাজার ৫১০ জন।
অর্থাৎ কয়েক বছর ধরে অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ফ্রন্টেক্সের হিসাবেও বাংলাদেশ শীর্ষে
ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ফ্রন্টেক্সের তথ্যও একই ধরনের চিত্র দেখাচ্ছে।
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশীরাই সবচেয়ে বেশি। এই পথটি কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় পথ নামে পরিচিত।
২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথ ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশী অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন বৈধ পথের বাইরে গিয়ে এত বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন?
এর উত্তর শুধু অর্থনৈতিক দুরবস্থায় খুঁজলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বৈধ অভিবাসনের সীমিত সুযোগ, বিদেশে যাওয়ার ব্যয়, দালালদের প্রভাব, ইউরোপ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা এবং সামাজিকভাবে দ্রুত সফল হওয়ার চাপ—সবকিছু মিলেই এই প্রবণতাকে শক্তিশালী করছে।
শুধু দালাল ধরলেই সমস্যার সমাধান হবে না
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, নথিভুক্ত ২ হাজার ১৮৮ মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম। কারণ অনিয়মিত পথে ঘটে যাওয়া অনেক মৃত্যুর কোনো রেকর্ড তৈরি হয় না।
তার মতে, শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের মধ্যেও ইউরোপে যাওয়ার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অনেকেই ১৫-২০ লাখ টাকা খরচ করেও ঝুঁকিপূর্ণ পথকে স্বাভাবিক ও নিশ্চিত গন্তব্য হিসেবে দেখছেন।
এখানে আরেকটি জটিলতা রয়েছে। কেউ কেউ বৈধ ভিসা নিয়ে দেশ ছাড়লেও তাদের প্রকৃত লক্ষ্য থাকতে পারে ইউরোপে পৌঁছানো। ফলে শুধু কাগজপত্র দেখে অভিবাসনের উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
আসিফ মুনীরের মতে, বিমানবন্দরে শেষ মুহূর্তের যাচাই-বাছাই জোরদার করা, ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে ইন্টারপোল ও যেসব দেশকে যাত্রাপথ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেসব দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
কারণ মানব পাচার একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো অপরাধ নয়। এটি বহু দেশের সঙ্গে যুক্ত একটি আন্তঃদেশীয় ব্যবসায়িক চক্র।
সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ
মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ করতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সরকার অনিয়মিত অভিবাসনের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং যেসব এলাকা থেকে বেশি মানুষ এই পথে যাচ্ছে, সেখানে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত দেশের বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তবে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু অবৈধ পথ বন্ধ করা নয়। একই সঙ্গে বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
কারণ মানুষ যদি বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ না পায়, অথচ বিদেশে কাজের চাহিদা ও আকর্ষণ অব্যাহত থাকে, তাহলে দালালচক্রের জন্য নতুন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না।
বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
সরকার বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ বাড়ানো এবং বন্ধ শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর চেষ্টা করছে। বিদেশগামী কর্মীদের ন্যূনতম দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার কথাও বলা হচ্ছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে বন্ধ করা নয়, বরং সেই স্বপ্নকে নিরাপদ ও বৈধ পথে নিয়ে যাওয়া।
একজন তরুণ যদি বৈধভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে যেতে পারেন, তাহলে তার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে না। পরিবারকে জমি বিক্রি করে দালালের হাতে বিপুল অর্থ তুলে দিতে হবে না। আর রাষ্ট্রও জানতে পারবে তার নাগরিক কোথায় যাচ্ছে এবং কী অবস্থায় আছে।
মৃত্যুর এই হিসাব আসলে কী বলছে?
২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের ২ হাজার ১৮৮ মৃত ও নিখোঁজ বাংলাদেশীর হিসাব কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং কখনো কখনো বছরের পর বছর ধরে চলা অপেক্ষা।
কারও মরদেহ সাগরে হারিয়ে গেছে। কেউ মরুভূমিতে মারা গেছেন। কেউ সীমান্ত পেরোতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আবার কেউ নিখোঁজ হয়েছেন এমনভাবে, যার কোনো শেষ খবরও পরিবার পায়নি।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই সংখ্যাগুলোও হয়তো পূর্ণ নয়।
কারণ সমুদ্রে ডুবে যাওয়া প্রতিটি নৌযানের হিসাব থাকে না। প্রতিটি নিখোঁজ মানুষের পরিচয় নিশ্চিত হয় না। প্রতিটি মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত যায় না।
তাই ২ হাজার ১৮৮-কে চূড়ান্ত সংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বরং নথিভুক্ত ন্যূনতম ক্ষতির হিসাব।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। ইউরোপে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থামিয়ে দেওয়া যাবে না, কিন্তু মৃত্যুর পথে যাত্রা থামানো সম্ভব। তার জন্য দরকার বৈধ বিদেশগমনের সুযোগ বাড়ানো, দক্ষতা উন্নয়ন, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, বিমানবন্দর ও সীমান্তে কঠোর নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য বিনিময়।
কারণ ইউরোপের পথে একটি নৌকা ডুবে গেলে শুধু কয়েকজন যাত্রী হারিয়ে যান না—একসঙ্গে ডুবে যায় বহু পরিবারের সঞ্চয়, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের আশা।

