চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শনিবার সকালে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় চিকিৎসাসেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের যেমন তীব্র গরম ও অন্ধকারের মধ্যে সময় কাটাতে হয়েছে, তেমনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বহির্বিভাগের কার্যক্রম এবং নির্ধারিত অস্ত্রোপচারেও দেখা দিয়েছে ধীরগতি।
সকাল পৌনে ৯টা থেকে বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। জরুরি অস্ত্রোপচার বিশেষ ব্যবস্থায় চালু রাখা সম্ভব হলেও ছোট-বড় অন্যান্য অস্ত্রোপচারের সময়সূচিতে প্রভাব পড়ে। একই সময়ে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের ছয়টি এক্স-রে মেশিন এবং আলট্রাসনোগ্রাফিসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন যন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়।
ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কেউ পরীক্ষা করাতে পারেননি, কেউ আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসার পরও দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। বহির্বিভাগের টিকিট বিতরণেও বিঘ্ন ঘটে। সব মিলিয়ে একটি বড় সরকারি হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহের সাময়িক বিচ্ছিন্নতা কীভাবে একসঙ্গে বহু সেবাকে প্রভাবিত করতে পারে, এ ঘটনা তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় শুধু চিকিৎসা কার্যক্রমই নয়, রোগীদের স্বাভাবিক অবস্থায় থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে। তীব্র গরমের মধ্যে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনকে হাতপাখা ও চার্জার ফ্যান ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।
বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডের রোগীদের ভোগান্তি ছিল বেশি। শিশুদের শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি গরম ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তাদের স্বজনদের উদ্বেগও বাড়িয়ে দেয়। হাসপাতালের মতো স্থানে কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা সাধারণ কোনো ভোগান্তির বিষয় নয়; এখানে এর সঙ্গে সরাসরি চিকিৎসা ও রোগীর নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।
একই সময়ে দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরও সমস্যায় পড়তে হয়। অনেকে নির্দিষ্ট পরীক্ষা করানোর জন্য হাসপাতালে এলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সেবা নিতে পারেননি। বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর সেবাগুলো ধীরে ধীরে চালু হলেও ততক্ষণে বিভিন্ন বিভাগে রোগীর চাপ জমে যায়।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের ওপর। ছয়টি এক্স-রে মেশিন এবং আলট্রাসনোগ্রাফির যন্ত্র বন্ধ থাকায় রোগীদের পরীক্ষা করানো সম্ভব হয়নি।
রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের প্রধান কাজী মো. আলম জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় সকালে এক্স-রে করা সম্ভব হয়নি। আলট্রাসনোগ্রাফির যন্ত্র চালানোর জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হওয়ায় বিদ্যুৎ ছাড়া সেটিও চালু রাখা যায়নি। ফলে রোগীদের চাপ বেড়ে গিয়ে পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
এখানেই বিদ্যুৎনির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা সামনে আসে। একটি হাসপাতালের আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্র যত বেশি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হবে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার গুরুত্বও তত বাড়বে।
বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর অবশ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা আবার শুরু হয়। কিন্তু যেসব রোগীর নির্ধারিত পরীক্ষা ওই সময়ের মধ্যে করা সম্ভব হয়নি, তাদের অনেককেই পরবর্তী সময়ে আবার হাসপাতালে আসতে হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব শুধু ওই আড়াই ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর রেশ পরবর্তী সময়েও থেকে গেছে।
বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালের বিভিন্ন অস্ত্রোপচার কক্ষে নির্ধারিত সময়ে বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচার শুরু করা যায়নি। তবে জরুরি অস্ত্রোপচার বিশেষ ব্যবস্থায় চালু রাখা হয়েছিল।
চিকিৎসাব্যবস্থায় জরুরি ও নির্ধারিত অস্ত্রোপচারের পার্থক্য থাকলেও উভয়ের জন্যই নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ অপরিহার্য। অস্ত্রোপচার কক্ষের আলো থেকে শুরু করে নানা ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যন্ত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে চিকিৎসকদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় এবং নির্ধারিত কার্যক্রমে সময়সূচির পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এই ঘটনার ক্ষেত্রে জরুরি সেবাগুলো সচল রাখা সম্ভব হলেও সব ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা যায়নি। এতে বোঝা যায়, হাসপাতালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও সেটি সব ধরনের সেবা একসঙ্গে চালু রাখার জন্য যথেষ্ট নয়।
চমেক হাসপাতালে জেনারেটরের ব্যবস্থা রয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর জরুরি বিভাগ, আইসিইউসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু সেবা জেনারেটরের মাধ্যমে চালু রাখা হয়। কিন্তু বড় ও উচ্চ ক্ষমতার চিকিৎসা সরঞ্জামের সবগুলো জেনারেটরের মাধ্যমে চালানো সম্ভব হয়নি।
ফলে জেনারেটর থাকা সত্ত্বেও এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি এবং অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ রাখতে হয়।
এখানে শুধু জেনারেটর থাকা বা না থাকার প্রশ্ন নয়; হাসপাতালের জন্য এমন একটি বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রয়োজন, যা মূল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রগুলোকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখতে পারে। বিশেষ করে বড় হাসপাতালের ক্ষেত্রে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা, যন্ত্রের বিদ্যুৎ চাহিদা এবং জরুরি অগ্রাধিকার—সবকিছু সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চমেকের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা এক শিশুর অভিভাবক মো. সোলাইমান জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় রোগী ও স্বজনদের তীব্র গরমের মধ্যে থাকতে হয়েছে। ওয়ার্ড অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসা কার্যক্রমেও সমস্যা তৈরি হয়। অনেক স্বজনকে চার্জার ফ্যান ও হাতপাখা দিয়ে রোগীদের বাতাস করতে হয়েছে।
পরীক্ষা করাতে আসা আব্দুল মান্নানের অভিজ্ঞতাও ছিল একই রকম। বিদ্যুৎ না থাকায় তিনি এক্স-রে করাতে পারেননি। তার সঙ্গে থাকা আরেকজনের আলট্রাসনোগ্রাফিও করা সম্ভব হয়নি। জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তাদের আবার হাসপাতালে আসার প্রয়োজন তৈরি হয়।
নাসিরাবাদ থেকে আসা মো. শরীফ সকাল সাড়ে ৯টায় চক্ষু বিভাগের বহির্বিভাগে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। বিদ্যুৎ না থাকায় তখন টিকিট পাওয়া যায়নি। বেলা সাড়ে ১১টার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে টিকিট দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক দেখাতে তার বেলা ২টা বেজে যায়।
তার মতো আরও অনেক রোগীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগে নারী, পুরুষ ও শিশুদের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অনেক রোগী সেদিন নির্ধারিত পরীক্ষা করাতেই পারেননি।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টেডিয়াম এলাকার একটি বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে তার সংযোগ ও জরুরি মেরামতকাজের জন্য শনিবার সকাল থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। চমেক হাসপাতালও ওই সরবরাহ লাইনের আওতাভুক্ত।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীদের দুর্ভোগ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি জানালে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা হয়।
পিডিবির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না করা হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা কঠিন হবে।
এ বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—পরিকল্পিত মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন থাকলেও হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার আগে বিকল্প ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। কারণ সাধারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা যে ক্ষতি তৈরি করে, হাসপাতালে তার প্রভাব অনেক বেশি গুরুতর হতে পারে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় জেনারেটর সচল রাখার পাশাপাশি নতুন জেনারেটর যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হাসপাতালে একটি নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হাসপাতালের বিদ্যুৎ নির্ভরতা ও ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে শুধু নতুন যন্ত্র বা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত উৎপাদনক্ষমতা, জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মহড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রের জন্য পৃথক বিদ্যুৎ সুরক্ষা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চমেকের সাম্প্রতিক ঘটনা মূলত একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে—হাসপাতালের জন্য বিদ্যুৎ কোনো সহায়ক সুবিধা নয়, এটি চিকিৎসাসেবার অন্যতম মৌলিক অবকাঠামো।
আধুনিক হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতাও তত বাড়ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র, অস্ত্রোপচার কক্ষ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রোগীর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ওষুধ সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন।
তাই চমেক হাসপাতালে আড়াই ঘণ্টার এই বিদ্যুৎ বিপর্যয়কে কেবল সাময়িক একটি সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বড় হাসপাতালগুলোর বিদ্যুৎ নিরাপত্তা, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা চালু রাখার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
চমেক কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে নতুন জেনারেটর এবং নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ বিভাগের মেরামতকাজ, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা আকস্মিক বিদ্যুৎ বিপর্যয় কোনোভাবেই হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসেবাকে বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে না পারে।
কারণ একটি হাসপাতালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া মানে শুধু আলো নিভে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে থেমে যেতে পারে পরীক্ষা, বিলম্বিত হতে পারে চিকিৎসা, পিছিয়ে যেতে পারে অস্ত্রোপচার—আর সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সেই রোগীরাই, যারা সুস্থ হওয়ার আশায় হাসপাতালে আসেন।

