আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএনপি সরকার। এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় ভরসা রাখা হয়েছে সেবা খাতের ওপর। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন কর্মসংস্থানের বড় অংশই আসবে এই খাত থেকে। তবে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়লেই কি দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ, স্থায়ী ও ভালো আয়ের সুযোগ তৈরি হবে?
সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৬ কোটি ৯১ লাখ কর্মরত মানুষের সংখ্যা ২০৩০-৩১ অর্থবছরে বেড়ে ৭ কোটি ৮৮ লাখে পৌঁছাবে। এর সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থান যুক্ত হলে মোট বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ কোটি ২ লাখ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে দেশের ভেতরে সেবা খাতে প্রায় ৫৮ লাখ, শিল্প খাতে ৩৩ লাখ এবং কৃষি ও বিদেশে কর্মসংস্থান মিলিয়ে বাকি কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
তবে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই নতুন কর্মসংস্থানগুলো কতটা উৎপাদনশীল হবে এবং কতটা মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারবে।
সেবা খাতের ওপর বাড়ছে নির্ভরতা
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশ কৃষিনির্ভর। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, কৃষিতে কর্মরত মানুষের হার ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সেবা খাতে ৩৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং শিল্প খাতে ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
সরকার আশা করছে, সেবা খাতে কর্মসংস্থান আরও ৫৮ লাখ বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৩ কোটি ২১ লাখে পৌঁছাবে। অর্থাৎ দেশের নতুন অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের প্রায় ৬০ শতাংশের দায়িত্ব নিতে হবে এই খাতকে।
এর পেছনে যুক্তি হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতা সেবা খাতে তুলনামূলক বেশি। কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্থিতিস্থাপকতা সেবা খাতে ০ দশমিক ৫৫, উৎপাদন শিল্পে ০ দশমিক ৪৫, নির্মাণ ও খনন খাতে ০ দশমিক ৫০ এবং কৃষিতে ০ দশমিক ১০।
তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সেবা খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
এই সময়ে সেবা খাতে প্রায় ৩০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলেও শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। যদিও একই সময়ে শিল্প উৎপাদন বছরে প্রায় ৯ শতাংশ হারে বেড়েছে। এর একটি কারণ হলো, শিল্প খাতে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও বেশি মূলধন ব্যবহারের কারণে উৎপাদন বাড়লেও একই হারে নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে না।
সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের মান
অর্থনীতিবিদদের মতে, সেবা খাত বড় কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, কিন্তু সব ধরনের সেবা খাতের কাজ সমান নয়।
শ্রম অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, বর্তমানে দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশ কৃষি ও স্বল্প দক্ষতার সেবা খাতে কেন্দ্রীভূত। তাই সরকারের প্রক্ষেপণ অনেকটা বর্তমান প্রবণতার ধারাবাহিকতা অনুসরণ করছে।
তার মতে, স্বল্পমেয়াদে সেবা খাত মানুষের জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রয়োজন দক্ষতাভিত্তিক উৎপাদন শিল্প এবং উচ্চমূল্যের সেবা খাত।
তিনি মনে করেন, শুধু চাকরির সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ কর্মসংস্থান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, আধুনিক সেবা খাত যেমন তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থব্যবস্থা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পর্যটন ও পেশাদার ব্যবসায়িক সেবা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সেবা খাতের মধ্যে ছোট ব্যবসা, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও কম আয়ের কাজও রয়েছে। ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে যে নতুন কর্মসংস্থানের বড় অংশ হয়তো কম উৎপাদনশীল কাজে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
শিল্প খাতের গুরুত্ব এখনো কমেনি
অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল মনে করেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য শিল্প খাতকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তার মতে, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, শক্তিশালী উৎপাদন ভিত্তি তৈরি হওয়ার পর সেবা খাত আরও দ্রুত বিকশিত হয়। কারখানা গড়ে উঠলে তার চারপাশে পরিবহন, রপ্তানি, আমদানি, ব্যবসায়িক সহায়তা ও অন্যান্য সেবা খাতের প্রসার ঘটে।
তিনি বলেন, শুধু ছোট ছোট ব্যবসা যেমন মোবাইল দোকান বা অনুরূপ কার্যক্রম বাড়লেই তা বড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে না।
চীন ও ভিয়েতনামের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনো পর্যাপ্ত শক্তিশালী শিল্পভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।
কর্মসংস্থান পরিকল্পনার হিসাব কতটা নির্ভরযোগ্য?
সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে এর হিসাবের ভিত্তি নিয়ে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর্মসংস্থানের এই হিসাব পুরোনো কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল এবং বর্তমান শ্রমবাজারের পরিবর্তনগুলো পুরোপুরি বিবেচনায় নেয়নি।
তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক নির্ধারণে ব্যবহৃত কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতার হিসাব ২০১৭ সাল পর্যন্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও একই অনুপাতে চাকরি বাড়েনি।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শুধু কতগুলো চাকরি তৈরি হবে তা নয়, কী ধরনের চাকরি তৈরি হবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বড় বাধা
বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অনানুষ্ঠানিক কাজের আধিক্য।দেশের মোট কর্মরত মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত। নারী ও তরুণদের ক্ষেত্রে এই হার ৯২ শতাংশের বেশি।
সরকার দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, প্রথমবার চাকরিতে প্রবেশকারীদের সহায়তা এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগের কথা বলেছে। তবে অনিরাপদ ও কম আয়ের কাজ থেকে মানুষকে স্থায়ী ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে নিয়ে আসাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
এছাড়া বিদেশে কর্মসংস্থানের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বছরে ১১ লাখ ২০ হাজার থেকে বেড়ে ১৫ লাখ ৮০ হাজার হতে পারে। পাঁচ বছরে মোট বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা ধরা হয়েছে ৬৫ লাখ ৩০ হাজার।
কিন্তু এই সংখ্যা নতুন কর্মসংস্থান হিসেবে সরাসরি গণনা করা যাবে না, কারণ বিদেশে আগে থেকে থাকা কর্মীদের ফেরত আসার বিষয়টি এতে বাদ রয়েছে।
আসল পরীক্ষা হবে কর্মসংস্থানের গুণগত মানে
এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিঃসন্দেহে বড় একটি পরিকল্পনা। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে শুধু সংখ্যার ওপর নয়, বরং কর্মসংস্থানের মানের ওপর।
প্রয়োজন হবে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন শিল্প গড়ে তোলা, রপ্তানি খাত সম্প্রসারণ এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা।
অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহ মনে করেন, এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যকে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এটি বাস্তব সফলতায় পরিণত করতে হলে নতুন শিল্প, নতুন প্রতিষ্ঠান এবং নতুন ধরনের দক্ষতার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন থাকবে, দেশে শুধু এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে কি না, বরং সেই কর্মসংস্থান কতটা নিরাপদ, সম্মানজনক এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর হবে।

