গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের কল্যাণ, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকটির নেতৃত্ব দেন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নিজে, আর তার সঙ্গে ছিলেন সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের সচিব। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পররাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, আইন, সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য, যুব ও ক্রীড়া, শ্রম, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যেমন রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়ে একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠন করেছে, একইভাবে দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, গুম হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছেন কিংবা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে বছরের পর বছর কারাভোগ করেছেন, তাদের ত্যাগও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে চায়। তার ভাষ্যে, ভবিষ্যতে কোনো কর্তৃত্ববাদী শক্তি যাতে একইভাবে মানুষের অধিকার হরণ করতে না পারে এবং কোনো পরিবারকে যেন এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রিয়জন হারাতে না হয়, সে জন্যই এই উদ্যোগ।
সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল মানুষের স্বাধীন জীবনযাপনের অধিকার, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভোটাধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রীয় মদদে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেই চেতনাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যারা জীবন দিয়েছেন বা নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধি নির্ধারণকারী বিদ্যমান বিধিমালার সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন করে নতুন এই দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি জাতিসংঘের ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকারের অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক নীতিমালা এবং দেশের সংবিধান অনুসরণ করে এই কল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নের কৌশল নিয়েও কথা হয়।
আলোচনায় তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সম্পূর্ণ নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের অধিকার এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে সময়োপযোগী নতুন আইন তৈরি করা। তৃতীয়ত, মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধিসংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধন করে এই দায়িত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে এই কার্যক্রম পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বাধা না থাকে।
সার্বিকভাবে এই উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ন্যায়বিচার ও স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ত্যাগ ও কষ্টের স্বীকৃতি এবং যথাযথ পুনর্বাসন। নতুন অধিদপ্তর কার্যকর হলে এসব পরিবারের আইনি সুরক্ষা, চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এই অধিদপ্তর কত দ্রুত কার্যকর হবে এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়ে আগামী দিনগুলোতে বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

