সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষের কাছে দ্রুত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক করিডরে ৬০টি বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স নামানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসার সময় কমিয়ে আনতে এসব অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশের জন্য দেওয়া হয়েছে ৮০টি মোটরসাইকেল। সপ্তাহের সাত দিন, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এই জরুরি সেবা চালু থাকবে।
সোমবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সড়ক ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পোস্ট-ক্র্যাশ রেসপন্স অ্যাম্বুলেন্স’ সেবার উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় নতুন এই জরুরি সাড়া ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে চিকিৎসার আওতায় আনা গেলে প্রাণহানি ও গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই নির্দিষ্ট মহাসড়ক করিডরে অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত কর্মী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে মোট ৫০০ কিলোমিটার মহাসড়কে তিনটি করিডরে ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে জয়দেবপুর থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ২২৭ কিলোমিটার, জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এবং হাটিকুমরুল হয়ে বগুড়া থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৭০ কিলোমিটার সড়ক এই ব্যবস্থার আওতায় থাকছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গড়ে প্রতি ১০ কিলোমিটার পরপর একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হবে। ফলে কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর কাছাকাছি অবস্থানে থাকা অ্যাম্বুলেন্সকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো সম্ভব হবে। নির্দিষ্ট করিডরে দুর্ঘটনার পর রোগী পরিবহনের প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি জরুরি সাড়া দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শুধু অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়েই কার্যক্রম শেষ হবে না। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় কল সেন্টার পুরো উদ্ধার প্রক্রিয়া সমন্বয় করবে। নির্ধারিত হটলাইনে ফোন পাওয়ার পর অপারেটর দুর্ঘটনার স্থান, দুর্ঘটনার ধরন এবং আহত মানুষের সংখ্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবেন। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মী ও সংস্থাগুলোকে দ্রুত সতর্ক করা হবে।
দুর্ঘটনার স্থানে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। সেই সময়টিকে কাজে লাগানোর জন্য নির্বাচিত মহাসড়ক করিডরের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ মিটার অন্তর দুজন করে স্বেচ্ছাসেবককে প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার কথা।
প্রশিক্ষিত এসব স্বেচ্ছাসেবক বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করবেন। তাঁদের প্রত্যেককে প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামসহ একটি ফার্স্ট এইড বক্স এবং পরিচিতিমূলক পোশাক দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আহত ব্যক্তির প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ থাকবে।
দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়ার পর স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্স চালক, চিকিৎসা সহকারী ও সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়কদের কাছেও সতর্কবার্তা পাঠানো হবে। স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে দুর্ঘটনার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর নিকটবর্তী সাইট অফিস থেকে প্রয়োজনীয় অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হবে।
পরিস্থিতি গুরুতর হলে কেন্দ্রীয় কল সেন্টার ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমন্বিতভাবে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে একাধিক সংস্থাকে দ্রুত একই ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে তিনজন করে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল নিবন্ধিত স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ দায়িত্ব পালন করবেন। আট ঘণ্টার পালায় তাঁদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে। এর ফলে ২৪ ঘণ্টাই অ্যাম্বুলেন্সে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী রাখার ব্যবস্থা থাকবে।
সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক মিনিট অনেক সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির অবস্থা গুরুতর হলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা ও নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন ব্যবস্থায় তাই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া থেকে শুরু করে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং হাসপাতালে নেওয়া—পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ উদ্যোগের সঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং সড়কের বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য হাইওয়ে পুলিশকে ৮০টি মোটরসাইকেল হস্তান্তর করা হয়েছে। মহাসড়কে টহল ও দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব যান ব্যবহার করা হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর ক্ষয়ক্ষতি সীমিত করাও এখন সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ সব দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। নতুন অ্যাম্বুলেন্স সেবার মূল লক্ষ্যও সেই জায়গায়।
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় নয়, স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি চালকদের প্রশিক্ষণ ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুর্ঘটনার কারণ কমাতে শুধু চালক বা পথচারীর আচরণের দিকে নজর দিলেই হবে না, সড়কের অবকাঠামো, সংযোগস্থল, বাজার, যানবাহনের ফিটনেস এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি জানান, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আইনটি করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন ধাপে ধাপে স্ক্র্যাপ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সড়কের ওপর থাকা ঝুঁকিপূর্ণ বাজার সরানো, বিভিন্ন সংযোগস্থলের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং সড়কের প্রয়োজনীয় মার্কিং উন্নত করার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং ট্রমা সেন্টার কার্যকর রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে দুর্ঘটনা মোকাবিলায় দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং দ্বিতীয়টি হলো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা। নতুন এই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা মূলত দ্বিতীয় অংশকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক সময়ে সাড়া দেওয়া, কল সেন্টারের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের সমন্বয় এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার ওপর।
একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর অ্যাম্বুলেন্স রাখার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে যানজট, রাস্তার অবস্থা, আবহাওয়া, দুর্ঘটনার সঠিক অবস্থান এবং একই সময়ে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটলে অ্যাম্বুলেন্সের চাহিদা—এসব বিষয় সেবার বাস্তব কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ করে অ্যাম্বুলেন্সের অবস্থান ও সংখ্যা প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের যুক্ত করার উদ্যোগটিও এ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দুর্ঘটনার পর আশপাশের মানুষই অনেক সময় প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করা গেলে অ্যাম্বুলেন্স আসার আগের সময়টুকু কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তবে তাঁদের কাজের সীমা, প্রশিক্ষণের মান এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার বিষয়টিও নিয়মিত তদারক করতে হবে।
সব মিলিয়ে ৫০০ কিলোমিটার মহাসড়কে ৬০টি অ্যাম্বুলেন্স, ৮০টি মোটরসাইকেল, কেন্দ্রীয় কল সেন্টার, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে নতুন যে ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, তা দেশের সড়ক দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এর সাফল্য নির্ভর করবে দুর্ঘটনার খবর থেকে শুরু করে উদ্ধার ও চিকিৎসা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কত দ্রুত ও সমন্বিতভাবে সাড়া দেওয়া যায় তার ওপর। কার্যকরভাবে পরিচালনা করা গেলে মহাসড়কে দুর্ঘটনার পর আহত মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সময় কমানোর পাশাপাশি প্রাণহানি কমাতেও এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।

